বাংলা সিনেমার ইতিহাসে কিছু জুটি থাকে, যাদের নাম আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দিতে হয় না। নাম বললেই চোখের সামনে একটা সময়, একটা আবেগ, একটা গান ভেসে ওঠে। ঠিক যেমন উত্তম–সুচিত্রা বললেই কৃষ্ণচূড়া রোদ, ট্রামলাইন আর সাদা-কালো প্রেম। ঠিক তেমনই নব্বইয়ের দশকে এসে সেই জায়গাটা দখল করে নেয় আরেক জুটি—সালমান শাহ ও শাবনূর।
মাত্র তিন বছরের ক্যারিয়ার। একসঙ্গে কাজ করেছেন মোটে ১৪টি সিনেমায়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এই ১৪টি ছবির একটাও ফ্লপ নয়। অলটাইম ব্লকবাস্টার আছে, সুপারহিট আছে, হিট আছে, এমনকি এভারেজও আছে—কিন্তু ব্যর্থতার কালো দাগ নেই কোথাও। এত অল্প সময়ে, এত কম কাজ করে পুরো বাংলার মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া—এটা কেবল স্টারডম নয়, এটা ইতিহাস।
নব্বইয়ের দশক তো সালমান শাহের নামেই বুদ হয়ে ছিল, সেটা নতুন করে বলার দরকার নেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সময় যত যাচ্ছে, এই জুটির জনপ্রিয়তা ততই বাড়ছে। আজকের প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরাও সালমান–শাবনূরকে চেনে, তাদের গান গুনগুন করে, দৃশ্য শেয়ার করে।
যেখানে অনেক পুরোনো জুটির নামই তারা জানে না, সেখানে এই জুটি রয়ে গেছে জীবন্ত। এর একটা বড় কারণ সম্ভবত তাদের ফ্যাশন সেন্স। এতটাই আধুনিক ছিল তাদের স্টাইল, পোশাক, উপস্থিতি—আজকের চোখে দেখলেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, এগুলো নব্বইয়ের দশকের বাংলা সিনেমা। বলিউড হলে হয়তো বিশ্বাস করা যেত, কিন্তু ঢালিউডে এতটা আধুনিকতা—সেই সময়ের জন্য ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য।
এই জুটির আরেকটা বড় শক্তি ছিল গান। প্রতিটি সিনেমার গান জনপ্রিয়—জনপ্রিয় মানে কেবল তখনকার সময়েই নয়, আজও। আজও নতুন প্রজন্মের মুখে মুখে শোনা যায় ‘পৃথিবীতে সুখ বলে যদি কিছু থেকে থাকে’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’র গান। অন্য অনেক জুটির তুলনায় এই গানগুলোর স্থায়িত্ব অনেক বেশি। যেন গানগুলোই তাদের প্রেমকে সময়ের ওপারে নিয়ে গেছে।
সালমান আর শাবনূরকে একসঙ্গে দেখলে আলাদা করে কিছু বলার দরকার পড়ে না। বয়সের পার্থক্য, উচ্চতা, গড়ন—সব মিলিয়ে তারা ছিলেন পর্দার জন্য একেবারে পারফেক্ট কাপল। একে অপরের পরিপূরক। একজন ছাড়া আরেকজন অসম্পূর্ণ মনে হয়। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়—বাংলা সিনেমার সবচেয়ে সফল ও জনপ্রিয় জুটির একটি হলো সালমান শাহ–শাবনূর।
আপনি শাবনূরকে পছন্দ নাও করতে পারেন। আপনি সালমান শাহকে ভালো নাও বাসতে পারেন। কিন্তু এই জুটিকে অপছন্দ করা প্রায় অসম্ভব। আর যারা করে, তারা হয়তো বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসটাই ঠিকভাবে জানে না। জনপ্রিয়তার বিচারে, প্রভাবের বিচারে—এই জুটি উত্তম–সুচিত্রার থেকে কোনো অংশে কম নয়।
এই অমর জুটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘তুমি আমার’ সিনেমা দিয়ে। সেখান থেকেই শুরু হয় এক সোনালি অধ্যায়। এরপর একে একে আসে ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘বিক্ষোভ’, ‘সুজন সখী’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘জীবন সংসার’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘বুকের ভেতর আগুন’—প্রায় ১৪টি সিনেমা। সময়ের সীমানা পেরিয়েও এই ছবিগুলো আজও ঢালিউডের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
‘জীবন সংসার’ সিনেমার সেই গান — ‘পৃথিবীতে সুখ বলে যদি কিছু থেকে থাকে’ —এখনো দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। সালমান শাহের পাশে শাবনূরকে এতটাই মানাত যে, তাদের কেমিস্ট্রি পর্দায় জমে ক্ষীর হয়ে যেত। নব্বইয়ের দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটি বললে তাই আজও প্রথমেই আসে এই দুজনের নাম।
দুঃখের জায়গাটা এখানেই। সালমান শাহ, শাবনূর আর পরিচালক মতিন রহমান—এই তিনজন মিলে নির্মিত হচ্ছিল আরেকটি পিওর রোমান্টিক ছবি, ‘মন মানেনা’। শুটিং চলছিল ভালোই, প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ শেষ। ঠিক তখনই এক ধমকা হাওয়া এসে সবকিছু থামিয়ে দেয়। আকস্মিকভাবে সালমান শাহের মৃত্যু শুধু একজন অভিনেতাকে নয়, একটা স্বপ্নকেও কেড়ে নেয়। ‘মন মানেনা’ আর সম্পূর্ণ হয়নি, সেই ছবির সঙ্গেই যেন থেমে যায় আরেকটি অবিস্মরণীয় প্রেমের গল্প।
‘তোমাকে চাই’-এর পর ‘মন মানেনা’ হতে পারত সালমান–শাবনূর জুটির আরেকটি কালজয়ী রোমান্টিক ছবি। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। সালমানের মৃত্যুর পর সেই ছবিতে তার জায়গায় রিয়াজকে নিয়ে কাজ শেষ করা হয়।
তবু ইতিহাস বদলায় না। অল্প সময়, অল্প কাজ—কিন্তু অসীম প্রভাব। সালমান শাহ–শাবনূর আজও বাংলা সিনেমার পাতায় অমর এক অধ্যায়। আর ব্যক্তিগতভাবে বললে—আমার সবচেয়ে প্রিয়টা আজও ‘আনন্দ অশ্রু’। আপনারটা কোনটি?