মুক্তিযুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে বহু উপন্যাস রচিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও হবে। তবে পাঠকের মনের আকুতি ও আকাঙ্ক্ষা অধিকাংশ উপন্যাস কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তি, দেশপ্রেমিক আপামর জনগণের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রেরণাকে নির্মোহ দৃষ্টিতে ও বিশাল ক্যানভাসে না দেখে, অধিকাংশ উপন্যাসে বহিঃস্থ ঘটনার রূপ সরল ও খণ্ডিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ‘বিপ্লব’ উপন্যাসটি পাঠকের সেই অতৃপ্তি নিঃসন্দেহে পূরণ করবে।
এই উপন্যাসে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনার চমকপ্রদ ও বিস্ময়কর বিস্তার এবং চরিত্রগুলোর স্নিগ্ধতা ও তীর্যকতা উপস্থাপনের বহুমাত্রিকতায় পাঠক কখন যে নিজেই ঘটনাপরম্পরা ও চরিত্রের অংশ হয়ে উঠবেন, বুঝতেও পারবেন না। তিনি নিজেই হয়ে উঠবেন পরিবারের এক সদস্য, একটি রেলস্টেশনের চা বিক্রেতা কিংবা স্টেশনে অপেক্ষমাণ একজন মা—যিনি বিশ্বাস করেন যে রূপেই হোক বিপ্লব আসবেই। এখানে উঠে এসেছে এক দুর্ধর্ষ বুদ্ধিমতী শিশুর গল্প, যার বুদ্ধিমত্তায় বেঁচে যায় শত-সহস্র বাঙালি। স্বাধীন পতাকার সংগ্রামে সে এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, যে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে পতাকার সঠিক ব্যবহারে মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকারের আক্রোশ থেকে রক্ষা করে।
অপার মুগ্ধতায় পাঠক অনুধাবন করবেন কীভাবে একটি পরিবারের আকাঙ্ক্ষা সকলের হয়ে যায়। একটি রেলস্টেশনের ঘটনাপরম্পরা, একটি নতুন পতাকা, একটি বিপ্লব ও একটি নতুন দেশের স্বপ্নকে কীভাবে একই মোহনায় মিলিয়ে দেয়। ভাষার সবুজ, সরল ও সহজতায় উপন্যাসের গভীরে অবগাহন করে যখন বই থেকে মুখ তুলবেন, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারিত হবে— “বাহ্! সত্যিই একটি অসাধারণ উপন্যাস।” উল্লেখ্য, উপন্যাসটির প্রচ্ছদ করেছেন উত্তম চৌধুরী।
সৈয়দ আশেক মাহমুদ
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সৈয়দ আশেক মাহমুদের জন্ম যশোর শহরে। তাঁর পিতা গোলাম মুহাম্মদ ছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অন্যতম সহযোগী। তাঁর মাতা সৈয়দা ফাতেমা খাতুন ঐতিহ্যবাহী ‘সওগাত’ ও ‘বেগম’ পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন। পারিবারিক ঐতিহ্যের সূত্র ধরেই তাঁর মাঝে সাহিত্যচর্চার অনুপ্রেরণা জাগে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তরুণ সমাজের একাংশ যখন তথাকথিত আধুনিক গদ্য ও সাহিত্যের ধারায় প্রভাবিত, তখন যশোর ক্যাথলিক মিশনের প্রধান ধর্মযাজক আশেক মাহমুদকে বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিক তথা সাধারণ মানুষের জন্য জাগরণমূলক সাহিত্য রচনায় উদ্বুদ্ধ করেন। সেখান থেকেই তিনি তাঁর লেখনীর ধারা পরিবর্তন করে সাধারণ মানুষের কল্যাণে অবিশ্রাম লিখতে থাকেন। মানবতার জন্য, দেশের জন্য ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি বাংলাদেশ রেডিও ও টেলিভিশনে গ্রন্থনা, অনুষ্ঠান পরিচালনা ও সম্প্রচারে বিশেষ অবদান রাখেন।
সৈয়দ আশেক মাহমুদ মাত্র ৯ বছর বয়সে মসিউল আজম সম্পাদিত ‘শতদল’ পত্রিকায় প্রথম লেখা প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্যজগতে পা রাখেন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁর প্রথম বই ‘বড় দিনের উপহার’ প্রকাশিত হয়। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১৫৬টি। এছাড়া তাঁর রচিত অসংখ্য নাটক ও গান রেডিও, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রে প্রচারিত হয়েছে।
উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি এবং শিক্ষা উপকরণ নির্মাণেও তিনি অনন্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। ব্র্যাকসহ দেশি-বিদেশি বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় তাঁর উদ্ভাবিত উপকরণের ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটেছে। তিনি জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন, মাইকেল সঙ্গীত একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম ও বাংলাদেশ ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরামসহ একাধিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।
১৯৮৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইন্টিগ্রেটেড ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ (আইভিডিসি)। বৈদেশিক সাহায্য ব্যতিরেকে নিজস্ব উপার্জিত অর্থে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহকে পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা উপকরণ বিক্রির লব্ধ অর্থ দিয়ে জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে। তিনি বিশ্বাস করেন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন সামর্থ্যবানদের নৈতিক দায়িত্ব এবং সদিচ্ছা থাকলে বৈদেশিক সাহায্য ছাড়াই উন্নয়ন সম্ভব।
সৈয়দ আশেক মাহমুদ ও তাঁর প্রতিষ্ঠান ইউনিসেফ (UNICEF), আইএলও (ILO), ইউএনডিপি (UNDP), সাইটসেভার্স, সেভ দ্য চিলড্রেন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল, বিআরডিবি, ব্র্যাক ও প্রশিকাসহ শতাধিক সংস্থাকে পরামর্শক (কনসালটেন্সি) সেবা দিয়ে আসছেন। শিক্ষামূলক সচিত্র বইয়ের জন্য তিনি ইউনেস্কোর ‘এসিিসিউ’ (ACCU) পুরস্কারসহ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।