বাংলা সাহিত্যে চিন্তার মৌলিকত্ব ও তীক্ষ্ণ যুক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে নিজস্ব অবস্থান গড়ে তুলেছেন বিশিষ্ট লেখক মোহাম্মদ নূরুল হক। একযুগের বেশি সময় ধরে সাহসের সঙ্গে সাহিত্যচর্চা করে আসা এই গুণী লেখকের সৃজনশীল ও মননশীল কাজ ইতোমধ্যে বোদ্ধা মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তিনি একাধারে কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক হলেও তাঁর কাজের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে গবেষণামূলক সাহিত্য। সম্প্রতি ‘বাংলা উপন্যাসে বিধবা’ বিষয়বস্তুকে উপজীব্য করে প্রকাশিত তাঁর বিশেষ গবেষণাগ্রন্থটি পাঠকদের চিন্তার গভীরে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তৎকালীন সমাজ বাস্তবতার নানামুখী দিক ফুটিয়ে তুলেছে।
মোহাম্মদ নূরুল হকের প্রাবন্ধিক সত্তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর সততা ও স্বকীয় ভাষাভঙ্গি। প্রাচীন ভাষাভঙ্গিকে বর্তমানের প্রচলিত রীতির সঙ্গে মিশেল দেওয়ার সহজাত ক্ষমতাই তাঁর লেখাকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র রূপ। বহু বিষয়ে নিজস্ব প্রগতিশীল অভিমত প্রকাশের কারণে তাঁর উপস্থাপন সবসময়ই প্রশ্নশীল ও তীক্ষ্ণ। তাঁর আলোচিত গবেষণাগ্রন্থ ‘বাংলা উপন্যাসে বিধবা’-তে তিনি শুধু তৎকালীন সমাজচিত্রই আঁকেননি, বরং তৎকালীন ঔপন্যাসিকদের বিধবাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিও চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। সাহিত্য গবেষণায় উৎসুক পাঠকদের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর খোরাক জোগাবে। গ্রন্থটির সর্বাধিক প্রচার ও প্রসার কাম্য।
১৯৭৬ সালের ১২ জুন নোয়াখালীর সুবর্ণচরের কেরামতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ নূরুল হক। পেশাগত জীবনে তিনি একজন দায়িত্বশীল সংবাদকর্মী। মূল পরিচয় কবি হলেও প্রবন্ধ, গবেষণা ও ছোটগল্পের চর্চায় তিনি সমান সক্রিয়। সম্পাদনা ক্ষেত্রেও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান; তিনি ‘চিন্তাসূত্র’, ‘মেঠোপথ’, ‘প্রাকপর্ব’ ও ‘অনুপ্রাস’-এর মতো সাহিত্যের ছোটকাগজ সম্পাদনা করেছেন।
সাহিত্যক্ষেত্রে তাঁর অবদানের প্রমাণ মেলে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ও প্রবন্ধের বিস্তৃত তালিকায়। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য কবিতার বইগুলো হলো: ‘মাতাল নদীর প্রত্নবিহার’ (২০০৯), ‘স্বরচিত চাঁদ’ (২০১১), ‘উপ-বিকল্প সম্পাদকীয়’ (২০১৬) এবং ‘লাল রাত্রির গান’ (২০২১)। অন্যদিকে তাঁর প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: ‘সাহিত্যে দশক বিভাজন ও অন্যান্য’ (২০১০), ‘সমালোচকের দায়’ (২০১১), ‘অহঙ্কারের সীমানা ও অন্যান্য’ (২০১২), ‘সমকালীন সাহিত্যচিন্তা’ (২০১২), ‘সাহিত্যের রাজনীতি’ (২০১৩), ‘কবিতার সময় ও মনীষার দান’ (২০১৬) এবং ‘আহমদ ছফার বাঙালি দর্শন ও অন্যান্য’ (২০২১)।
নিবেদিতপ্রাণ এই সাহিত্যিক তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টির জন্য অর্জন করেছেন একাধিক স্বীকৃতি ও সম্মাননা। তিনি প্রবন্ধের জন্য ‘বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার-২০২০’, কবিতার জন্য ‘দোনাগাজী পদক-২০২২’ এবং তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কবিতার সময় ও মনীষার দান’-এর জন্য ‘ঢাকা সাব এডিটরস কাউন্সিল সম্মাননা-২০২২’ লাভ করেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মোহাম্মদ নূরুল হকের এই গবেষণাগ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা।