বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বহুপ্রস্থ ও অনন্যপ্রতীম ব্যক্তিত্ব প্রমথনাথ বিশী (১৯০১-১৯৮৫)। একাধারে লেখক, শিক্ষাবিদ, অধ্যাপক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রমথনাথ বিশী সাহিত্য জগতে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তাঁর প্রখর বুদ্ধি, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গবোধ এবং স্বতন্ত্র শৈলীর গুণে। তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য (১৯৬২–৬৮) ও রাজ্যসভার সদস্য (১৯৭২–৭৮) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯০১ সালের ১১ জুন নাটোরের জোয়াড়ি গ্রামে এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন প্রমথনাথ বিশী। পিতা নলিনীনাথ বিশী এবং মাতা সরোজবাসিনী দেবী। ১৯১০ সালে শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মবিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা ঘটে, যেখানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তিনি অভিভাবক, শিক্ষক ও অনুপ্রেরণাদাতা হিসেবে কাছে পান। দীর্ঘ ১৭ বছর শান্তিনিকেতনে অধ্যয়ন শেষে ১৯২৯ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক এবং ১৯৩২ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে বাংলায় এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন।
শান্তিনিকেতনের ইতিকা-গৃহে অবস্থানকালে, রাবীন্দ্রিক আবহ ও পরিচলনের মধ্যেই ১৯২৪ সালে তিনি রচনা করেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দেশের শত্রু’ (প্রকাশিত ১৯২৫ সালে)। সে হিসেবে ২০২৫-২৬ মেয়াদে উপন্যাসটি রচনার শতবর্ষ পূর্ণ করল।
‘ *দেশের শত্রু’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট *
উপন্যাসটির ভূমিকাংশে লেখক প্রমথনাথ বিশী একে অভিহিত করেছেন ‘প্রবন্ধোপন্যাস’ হিসেবে। তাঁর মতে, এটি প্রবন্ধের চিন্তাশক্তি ও উপন্যাসের কল্পনাশক্তির সমন্বয়ে গঠিত এক ‘উভচর’ সৃষ্টি—যেখানে প্রবন্ধের পায়ে উপন্যাসের পাখা জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা উটপাখির মতো দ্রুত ছুটতে সাহায্য করে।
উপন্যাসটির মূল উপজীব্য ও উল্লেখযোগ্য দিকসমূহের মধ্যে রয়েছে- আন্দোলনের সমালোচনা: ১৯২২ সালের অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত এই উপন্যাসে তৎকালীন স্বদেশপ্রেমিক ও স্বদেশী কবিদের ভণ্ডামি এবং কপটতার প্রতি তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ ছুড়ে দেওয়া হয়েছে। ভণ্ড নেতৃত্বের স্বরূপ প্রকাশ: স্বরাজ প্রতিষ্ঠার নামে স্বার্থান্বেষী নেতাদের ‘স্বরাজ ফান্ড’ গঠন করে অর্থ আত্মসাৎ, নারী জাগরণের মেকী প্রচেষ্টা এবং নারীর প্রতি আসক্তপরায়ণ নেতাদের প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করা হয়েছে। রাজনীতির নাটকীয়তা: সত্যাগগ্রহীদের গ্রেপ্তার বরণের পেছনের নাটকীয়তা, জাতীয় শিক্ষার নামে কপটতা এবং অর্থের বিনিময়ে জনসমর্থন কেনার বাস্তব চিত্র উপন্যাসটিতে উঠে এসেছে। অন্তর্দ্বন্দ্ব ও আত্মঘাতী স্বদেশপ্রেম: ব্যক্তিগত প্রভাব বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দেশপ্রেমের পোশাক পরা ভণ্ড ব্যক্তিদের দেশের প্রকৃত শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ঔপন্যাসিক।
সাহিত্যকর্ম ও স্বীকৃতি
‘দেশের শত্রু’ দিয়ে উপন্যাস রচনার সূচনা করলেও পরবর্তীতে তিনি রচনা করেন ‘পদ্মা’ (১৯৩৫), ‘জোড়াদিঘীর চৌধুরী পরিবার’ (১৯৩৮), ‘কেশবর্তী’ (১৯৪১), ‘নীলমণির স্বর্গ’ (১৯৫৪), ‘সিন্ধুদেশের প্রহরী’ (১৯৫৫) এবং বিখ্যাত ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস ‘লাল কেল্লা’ (১৯৬৩)। তবে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে গণ্য করা হয় ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’ (১৯৫৮)-কে। ছোটগল্পকার ও নাট্যকার হিসেবেও তিনি সমান সফল ছিলেন। সাহিত্যকর্মে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি একাধিক সম্মাননায় ভূষিত হন। রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৬০) – ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’ উপন্যাসের জন্য। বিদ্যাসাগর স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮২) জগত্তারিণী স্বর্ণপদক (১৯৮৩) – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত।
‘দেশের শত্রু’ কেবল প্রমথনাথ বিশীর প্রথম উপন্যাসই নয়, বরং বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের ভারতীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অসংগতি ও ভণ্ডামির এক ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক দলিল।
বইটির বাংলাদেশ সংস্করণের প্রকাশক বাংলানামা। এটির প্রচ্ছদ করেছেন গৌরব চন্দ।