অভিনেতা শামস সুমন মারা গেছেন মঙ্গলবার সন্ধ্যায়। অসুস্থতা থেকে স্বাভাবিক মৃত্যুই হয়েছে তাঁর। খবরটা শোনার পর থেকেই মনটা ভার হয়ে আছে। তাঁকে প্রথম দেখি ৯০ দশকের শুরুতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের কোনও একটা নাটকে আমার বড় ভাই খালেদ খানের সঙ্গে অভিনয় করতে। প্রথম দেখাতেই চোখে লেগেছিল তাঁর স্পষ্ট শুদ্ধ উচ্চারণ, ভরাট কণ্ঠ আর খুব স্বাভাবিক অভিনয়ের জন্যে। আমি নিজে তখনও টেলিভিশনে অভিনয় করা শুরু করিনি। তারপর আমিও যখন টেলিভিশনে অভিনয় করতে শুরু করি, তখন দেখা হতো মাঝে মধ্যে। তাঁর সঙ্গে আমার খুব যে বন্ধুত্ব ছিল তেমন নয়। তবে আমি তাঁকে পছন্দ করতাম। তিনিও আমাকে পছন্দ করতেন, বুঝতে পারতাম। সুমন ভাই আমাকে ভাই ডাকতেন এবং আপনি করে বলতেন। যদিও ততদিনে আমি জেনেছি—তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ইমিডিয়েট বড় ভাই শুভর সহপাঠী ছিলেন। বলেছি সেটা কয়েকবার, তাতেও সম্বোধন বদলায়নি। ১৯৯৬ সালে আমি যখন দেশ ছেড়ে প্রবাসী হই তখনও দেশে টেলিভিশন বলতে ওই একটাই, বিটিভি। প্যাকেজ নাটক বলে একটা ব্যাপার ছিল। বাইরে থেকে নাটক বানিয়ে বিটিভির কাছে বিক্রি করা যেতো। সেই সময় আমরা যারা তরুণ অভিনেতা ছিলাম, তাদের মধ্যে সুমন ভাই ছিলেন অন্যতম। আমি অবশ্যই জনপ্রিয়তার নিরিখে বলছি না।
দীর্ঘ এক যুগের বেশি প্রবাসে থাকার ফলে দেশের টিভি নাটকের খোঁজ রাখা হতো না খুব একটা। তখনও ইউটিউব আসেনি। মাঝে মধ্যে দেশে এলে নিজে দুই-একটা নাটকে অভিনয় করে যেতাম। তখন দেখা হতো অনেকের সঙ্গে কাজের সুবাদে। এর মধ্যে দেশে প্রাইভেট টেলিভিশন এলো বেশ কিছু। একুশে টিভির জন্ম মৃত্যু কোনোটাই আমার দেখা হয়নি। আমি আগের একুশে টিভির কথা বলছি। বিটিভির যুগে তিন মাসে একটি নাটকে অভিনয় করার সুযোগ পাওয়াই কঠিন ছিল ৯০-এর দশকে। বুঝতে হবে তখন টেলিভিশনে আফজাল হোসেন বাদে আমাদের আগের জেনারেশন ও তার আগের জেনারেশনের সবাই ওই একটি টেলিভিশনেই অভিনয় করতেন। আফজাল ভাই তখন অভিনয় ছেড়ে বিজ্ঞাপন নির্মাণে মনোযোগী হয়েছেন। কাজেই প্রাইভেট টেলিভিশন আসায় অভিনেতাদের অনেক কাজের সুযোগ তৈরি হলো। বিদেশে বসে এসব জেনে খুব ভালো লাগতো। অভিনয়শিল্পীরা অনেক কাজ করছেন, ভালো আয় করছেন, শুধু অভিনয় করে সচ্ছল জীবনযাপন করতে পারছেন, তা জেনে সত্যি মনটা ভরে যেতো। খুব আনন্দ হতো একসময়ের সহকর্মীদের কথা ভেবে।
বিদেশে এক যুগের বেশি কাটিয়ে দেবার পর আমারও সাধ হলো দেশে ফিরে আসার। দেশে ফিরে কী করবো তা তখনও ঠিক করিনি। শুধু আমার বড় ভাই খালেদ খানের সাথে মাঝে মাঝে কথা হতো। তিনি কিন্তু আমাকে বলতেন যে দেশে এসে শুধু নাটকে অভিনয় করে সংসার চালানোর সুযোগ নেই। ফিরলে অন্য কিছু করতে হবে। আমার ইচ্ছেটা তবু যায় না। ২০০৮/০৯ সালের দিকে ঠিক করলাম দেশে ফিরে আসবো। তার আগে একবার এসে পুরো চিত্রটা দেখে যাবার ইচ্ছায় ঢাকায় এলাম মাসখানেকের জন্যে। তখন অভিনয় পেশা হয়ে গেছে বেশির ভাগ অভিনেতার জন্যে। সবাই শিফট ধরে নিয়মিত কাজ করেন। সম্মানিও ভালো পান বলে জানি। আমি আমার এক প্রযোজক বন্ধুকে বললাম, আমাকে তার নাটকের শুটিংয়ে নিয়ে যেতে। গাজীপুরের একটা আধাপাকা টিনশেডের বাড়িতে হচ্ছিল তার নাটকের শুটিং। সেখানে গিয়ে পুরোনো কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হলো। নতুনও বেশ কজন ছিল, যাদের আমি চিনতাম না। সেখানে দেখলাম, পাকা মেঝেতে কোনও কিছু না বিছিয়ে বালিশ ছাড়াই একজন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন। একজন বলল, ওটা সুমন ভাই। অন্যদের সঙ্গে গল্পের মাঝেই জাগলেন সুমন ভাই। দেখেই হই হই করে উঠলেন। কথা হলো অনেকক্ষণ। একপর্যায়ে আমি জানতে চাইলাম কেমন চলছে। উনি খুব রসিকতা করে নিজের মেঝেতে শুয়ে থাকার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘এই যে যেমন দেখছেন’, বলে হাসলেন। ফুল টাইম অভিনয় কেমন লাগছে, আয় রোজগার যথেষ্ট হয় কিনা—এসব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইছিলাম। তারপর অনেক কথার পর বললেন, ‘এটা কোনও মানুষের জীবন না। মাসে ২৫/২৬ দিন কাজ না করলে সচ্ছলভাবে সংসার চলে না। প্রতিদিন ভোরবেলা উঠে ব্যাগ নিয়ে শুটিংয়ের বাসে উঠে বসতে হয়। ফিরতে ফিরতে মাঝ রাত পার হয়ে যায়। ঘুমাতে যাবার আগেই পরের দিনের শুটিংয়ের জন্যে ব্যাগ গুছিয়ে রাখতে হয়। ভোরবেলা বের হবার সময় বাচ্চা ঘুমিয়ে থাকে। রাতে ফিরেও দেখি ঘুমাচ্ছে। আমার বাচ্চা আমার চোখের আড়ালেই বড় হচ্ছে। এটা কোনও মানুষের জীবন না।’
আমি চমকে উঠেছিলাম। একসঙ্গে এত নাটকের কাজ কি করে সামলান জানতে চাইলে হতাশা ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ‘কোনও রকমের প্রস্তুতি ছাড়াই সেটে গিয়ে হাজির হতে হয়। কখনও কখনও সেটে গিয়ে স্ক্রিপ্ট হাতে পাই। জাস্ট সংলাপ বলে দেওয়া।’
বুঝতে অসুবিধা হলো না এসব নিয়ে ক্ষরণ আছে ভেতরে ভেতরে। আমি সেদিনই সেখানে বসেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম দেশে ফিরলেও শুধু অভিনয় করে সংসার চালানোর কথা ভাবা যাবে না। করিওনি সেটা। দেশে ফিরে একেবারে ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছি, যে পেশা অবশ্য আমাকে আর অভিনয়েই ফিরতে দেয়নি।
এবারে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং পর্যবেক্ষণ
১. দেশে ৩০টির অধিক টিভি চ্যানেল থাকার পরেও মাত্র ৪০০/৫০০ অভিনেতার অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিতে পারার অবস্থা এখনও তৈরি হলো না কেন? শীর্ষের ২০/৩০ জন উদাহরণ হতে পারেন না এখানে।
২. নানা নামের সমিতির বহর দেখে মনে হবে এটা একটা বিশাল ইন্ডাস্ট্রি। সেই ইন্ডাস্ট্রিতে অভিনেতাসহ আর যারা যুক্ত আছেন, তাদের সুরক্ষার কোনও ব্যবস্থা এখনও হলো না কেন? যেকোনও দুর্যোগ বা অসুস্থতায় শিল্পীকে বা তার হয়ে সংগঠনকে মানুষের কাছে সাহায্যের জন্যে হাত পাততে হবে কেন? অভিনেতা বা কোনও টেকনিশিয়ান শুটিংয়ে আহত হলে—তার জন্যে কি সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছে সংগঠনগুলো?
৩. একটা নির্দিষ্ট বয়স পার হলেই অভিনেতারা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন কেন? কিছু ব্যতিক্রম বাদে পুরুষ অভিনেতা বয়স ৫০/৬০ পার হলে আর কাজ পান না। তাদের জন্যে তেমন কোনও চরিত্র লেখা হয় না। চরিত্র লেখা হলেও তা খুবই গৌণ এবং সম্মানিও যথাযথ নয়। নারী অভিনেতাদের জন্যে বিষয়টি আরও ভয়াবহ। বয়স ৪০ পার হলেই তারা বাতিলের খাতায়। এ কেমন ইন্ডাস্ট্রি, যেখানে একজন রাইসুল ইসলাম আসাদ, আফসানা মিমি, আজাদ আবুল কালাম, শহীদুজ্জামান সেলিম, আজিজুল হাকিম বা শামস সুমনকে প্রধান করে কোনও গল্প লেখা হয় না?
গতকাল (১৭ মার্চ) শামস সুমনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তাঁর নানান ইন্টারভিউ, ফটোকার্ড ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এক ইন্টারভিউতে দেখলাম—তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, তাঁকে কেউ অভিনয় করতে ডাকেন না। বয়স অনুযায়ী ততটা বুড়িয়ে যাননি বলে বাবার চরিত্রেও তাকে ভাবা হয় না। এসবই আক্ষেপের কথা। অভিনয় করতে না পেরে তিনি কি বিষাদে ভুগছিলেন? আরেক সিনিয়র অভিনেতা তাঁর ইন্টারভিউতে বলছিলেন যে শামস সুমন তাঁর চিকিৎসার ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। আজাদ আবুল কালাম জানালেন, তাঁকে জোর করে হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে। আমার কাছে এসবই বিষণ্ণতার লক্ষণ। একজন অভিনেতা যিনি অভিনয় করতে চান, তাঁর তা করতে না পারার মতো কষ্টের আর কী আছে! এটা যেকোনও মাধ্যমের শিল্পীর জন্যেই প্রযোজ্য।
কিছু দিন আগে শিল্পকলায় একটা অনুষ্ঠান শুরুর আগে গেস্টরুমে বরেণ্য অভিনেতা আফজাল হোসেনের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল। নানান কথার মাঝে আফজাল ভাই বললেন, ‘অভিনয়কে পেশা হিসেবে না নেওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।’ তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু রাইসুল ইসলাম আসাদের কাজ না পাওয়া নিয়ে আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘আসাদের মতো অভিনেতাকে কাজ না পেয়ে অভিমান করে দূরে চলে যেতে হয়!’ আমার তখন সুমন ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। গাজীপুরে শুটিং সেটে বসে উনি আমাকে যে আক্ষেপের কথা বলেছিলেন, সেই কথা মনে পড়ে। মনে মনে তাকে ধন্যবাদ জানাই, তিনি আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন এই ভেবে। সেই সুমন ভাই কাল চলে গেলেন। সময়ের অনেক আগেই চলে গেলেন। এসব মৃত্যু মানা যায় না। এসব মৃত্যু অনেক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। এই প্রশ্নগুলোর সমাধান ‘ইন্ডাস্ট্রির’ সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলোকেই করতে হবে। করতে না পারলে এমন করুণ আক্ষেপের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। আমরা কেবল হাহকার করে যাবো।
-শাহীন খান, অভিনেতা
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

