‘বুদ্ধিজীবীমঙ্গল’ কেবল স্মৃতিচারণ নয়

স্লাইড বাংলানামার বই

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্য ও বিচিত্র সৃষ্টিশীলতা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হলেও, তাঁর জটিল অসুস্থতা এবং অসুস্থতাকালীন মানস-গঠন নিয়ে পর্যালোচনার সুযোগ খুব বেশি হয়নি। ‘বুদ্ধিজীবীমঙ্গল’ গ্রন্থে আবুল মনসুর আহমদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিচারণার আলোয় উন্মোচিত হয়েছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের জীবনের এক অচেনা, নিভৃত ও মায়াময় জগৎ।

নজরুলের এই অসুস্থতা আর ১০টি সাধারণ ব্যাধির মতো ছিল না। এর গভীরে জড়িয়ে ছিল কবির নিজস্ব জীবনচারণ, মানসিক প্রবণতা এবং তৎকালীন সময়ের নানাবিধ সংকট ও টানাপোড়েন।

আবুল মনসুর আহমদ তাঁর ‘আত্মকথা’ গ্রন্থে ‘নজরুলের আধ্যাত্মিকতা’ উপ-শিরোনামে এই অদ্ভুত ও রহস্যময় দিনগুলোর যে বিবরণ তুলে ধরেছেন, তা নজরুল-চর্চায় এক অমূল্য দলিল। কবির কথাবার্তায় বাহ্যিক অসংলগ্নতা বা পাগলামি মনে হলেও, তার গভীরে লুকিয়ে ছিল এক গভীর আত্মিক ও মানসিক বোধ।

ড. কাজল রশীদ শাহীন প্রণীত গ্রন্থটিতে উঠে এসেছে নজরুলের এক মর্মস্পর্শী ঘটনার কথা। অফিসে এসে ডিকশনারি ও সূতায় বাঁধা পেপার-ওয়েটের সাহায্যে একটি প্র্যাকটিক্যাল ডেমোনস্ট্রেশন দিয়ে নজরুল সহকর্মী ও বন্ধু আবুল মনসুর আহমদকে বুঝিয়েছিলেন তাঁর ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্ত্রী প্রমীলা দেবীর পারস্পরিক মানসিক টানাপোড়েনের কথা। দুজনের গভীর প্রেম, অথচ মাঝখানে এক অদৃশ্য দেয়াল—স্ত্রীকে নিজের অবস্থায় টেনে তোলার করুণ আকুতি ও ব্যর্থতার আখ্যান কবি ফুটিয়ে তুলেছিলেন অদ্ভুত এক বৈজ্ঞানিক-আধ্যাত্মিক রূপকে।

যে কবি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে চির-উন্নত ‘বিদ্রোহের প্রতিমূর্তি’ এবং ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার নির্ভীক সম্পাদক, এক নিদারুণ রোগ কীভাবে সেই তেজস্বী মানুষকে ভেতরে ভেতরে একা, অসহায়, উদ্বিগ্ন ও বিভ্রান্ত করে তুলেছিল—আবুল মনসুর আহমদের সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তা অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে ধরা পড়েছে।

‘বুদ্ধিজীবীমঙ্গল’ কেবল দুজন মহান ব্যক্তিত্বের স্মৃতিচারণ নয়; এটি নজরুলের অসুস্থতাকালীন মনোজগৎ, স্ত্রী প্রমীলা দেবীর প্রতি তাঁর নিখাদ ভালোবাসা এবং আবুল মনসুর আহমদের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের এক অনন্য দলিল। বুদ্ধিজীবী প্রসঙ্গে রয়েছে অনন্য আরেকটি প্রবন্ধ। এ ছাড়াও রয়েছে আবুল মনসুর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কিত একাধিক নিবন্ধ, যেখানে তাঁদের সাহিত্যকীর্তি ও বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিজীবী হয়ে উঠবার কারণ-প্রকরণ হয়েছে বিশ্লেষিত।

আবুল মনসুর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে অনুসন্ধিৎসু পাঠক-গবেষক, অনুরাগী, সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য গ্রন্থটি বিশেষ উপকারে আসলে প্রকাশনা সফল হবে।
নজরুল বর্ষে বাংলানামা প্রকাশিত বইটির মুদ্রিত মূল্য ৪৫০ টাকা। প্রচ্ছদ করেছেন আল নোমান।

কাজল রশীদ শাহীন মনে করেন, ১৯২১ থেকে ১৯৭১ সময়পর্বে এই ভূখণ্ডে ‘বাংলাদেশের নবজাগরণ’ সংঘটিত হয়। যার উন্মেষ ১৯২১ থেকে ১৯৪৭-এ, বিকাশ ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬-তে, নির্মাণ ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১-এ। ‘বাংলাদেশের নবজাগরণ ও মুসলিম সাহিত্য সমাজ : অন্বেষা-অবলোকন-তত্ত্ব’, উনার এ সম্পর্কিত প্রস্তাবন ভাবনার বই।

জন্ম বাংলাদেশের নবজাগরণ সম্পন্ন হওয়ার পাঁচ বছর পর কুষ্টিয়ার ফিলিপনগরে। সরকার উমমত আলী ও খোদেজা খানমের আত্মজ, আট ভাই-বোনের মধ্যে পঞ্চম। লেখালেখি পারিবারিক আবহ থেকেই। বাবা অনিয়মিতভাবে যুক্ত ছিলেন লেখালেখিতে। সব ভাইবোনই কম-বেশি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত।

কাজল রশীদ শাহীন পিএইচ.ডি করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবুল আহসান চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে ‘আবু হেনা মোস্তফা কামাল’কে নিয়ে। স্বপ্ন দেখেন জাতীয় পর্যায়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের নবজাগরণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সংবাদপত্রকে জ্ঞান করেন ‘আরাধ্য ও অবিকল্প’। তিনি মনে করেন, ‘বাংলাদেশবাদ’ প্রতিষ্ঠিা করা সম্ভব হলে পূরণ হবে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা।
প্রতি
প্রথম বই ‘একবার বিদায় দে মা’ ক্ষুদিরামকে নিয়ে বিশেষ চিত্রনাট্য। দ্বিতীয় বই ‘এই আমি কোথাও নেই’ কবিতার। তৃতীয় বই ‘বাংলাদেশের নবজাগরণ ও মুসলিম সাহিত্য সমাজ : অন্বেষা-অবলোকন-তত্ত্ব’ প্রবন্ধ গবেষণা। চতুর্থ বই ‘প্রশ্নমঙ্গল : বুদ্ধিজীবীর অ আ ক খ’। পঞ্চম বই আবুল মনসুর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে ‘বুদ্ধিজীবীমঙ্গল’।

সাংবাদিকতা করেছেন ‘দৈনিক রূপালী’, ‘সংবাদ’, ‘প্রথম আলো’, ‘আলোকিত বাংলাদেশ’সহ আরও কয়েকটি গণমাধ্যমে। ছিলেন ‘দৈনিক বাংলা’র নির্বাহী সম্পাদক ও ‘খোলা কাগজ’-এর সম্পাদক। বর্তমানে কর্মরত আছেন ‘রাইজিংবিডি’র সম্পাদক পদে।
প্রতীতি রাখেন এই আপ্তবাক্যে-
‘কাজল রশীদ শাহীন
শূন্যের এক সর্বনাম’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *