‘হেমলতা’: ধর্ম, সমাজ ও আইনি বেড়াজালে বন্দি দুই জীবনের করুণ গল্প

বাংলানামার বই স্পেশাল

২০০৭ সালের লালমনিরহাট কারাগারের পটভূমিতে রচিত সাংবাদিক মো. উজ্জল হোসেনের (উজ্জল জিসান) উপন্যাস ‘হেমলতা’। এটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী দুই নর-নারী—হিন্দু ধর্মাবলম্বী হৈম এবং মুসলিম ধর্মাবলম্বী সেকেন্দারের জীবনের নির্মম বাস্তবতাকে উপজীব্য করে রচিত একটি জীবনমুখী গল্প। প্রথাগত পারিবারিক নির্যাতনের পাশাপাশি সমাজ, রাষ্ট্র ও আইনি ব্যবস্থার বেড়াজালে পড়ে দুটি উঠতি জীবন কীভাবে ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়, তা উপন্যাসের পৃষ্ঠায় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। বাঁচার আকুতিতে তারা ছুটে চললেও সমাজপতি ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের শোষণ তাদের পিছু ছাড়েনি। ক্রমাগত মামলা ও হামলার ঘাত-প্রতিঘাতে পরিবার দুটি সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসে এবং চরম অমানবিক পরিস্থিতিতে পড়ে দুই তরুণ-তরুণী মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

এই ঘোর অমানাবিক সংকটে যখন তাদের মানবাধিকার রক্ষায় কেউ এগিয়ে আসেনি, ঠিক তখন উপন্যাসে হেমলতার তার মাকে লেখা আবেগঘন চিঠিটি পাঠকের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয়। অবশেষে আশার আলো হয়ে আসেন এক বিচক্ষণ বিচারক, যার বিচারিক দক্ষতায় সেকেন্দার কারাগার থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু সেই মুক্তিও সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি। ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে—হেমলতার মুক্তি মিলতে মিলতে জীবনের সমীকরণ বদলে যায় এবং দুজনের পরিণতি ঘটে দুই বিপরীত মেরুতে।

বাস্তবধর্মী এই করুণ উপন্যাসের লেখক উজ্জল জিসানের শৈশব ও শিক্ষাজীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে বগুড়া ও লালমনিরহাটের গ্রামীন আবহাওয়ায়। ভেলাগুড়ি হাই স্কুল থেকে এসএসসি ও হাতীবান্ধা আলিমুদ্দিন ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছোটবেলা থেকেই মেঠোপথ, সাঁতার কাটা ও খেতাবুলার সহজ-সরল গ্রাম্য জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকা এই লেখক মানবিক বিষয় ও বাস্তব ঘটনা নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন। প্রচ্ছদশিল্পী প্রতীক মাহমুদের অলঙ্করণে প্রকাশিত এই উপন্যাসে লেখক তাঁর গভীর জীবনবোধ ও সাংবাদিকতার চোখ দিয়ে সমাজের এক নোংরা ও আড়ালে থাকা বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *