03:49 PM, 06 Nov 2020
নবারুণ ভট্টাচার্যের হারবার্ট কেন আত্মঘাতী!

কামরুননাহার এ্যামি
‘চৌবাচ্চার তেলাপিয়া গঙ্গাসাগরে চলল/ দোবেড়ের চ্যাং দেকবি, দোবেড়ের চ্যাং/ দেকাব? ক্যাট,ব্যাট,ওয়াটার,ডগ ফিশ…’

পকেটে এই চিরকুটখানি রেখে আত্মঘাতী হন ভূতবিশারদ হারবার্ট সরকার।কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হয়ে উঠে হারবার্ট সরকারের শেষকৃত্যের সময়কার এক অভানীয় ঘটনা।

নবারুণ ভট্টাচার্যের হারবার্ট আখ্যান পড়ে মনটা পুরোনো বাড়ির রোদ না পাওয়া কলতলায় মতো স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে আছে। অসম্ভব রকম মন কেমন করা ভাব কিছুতেই যাচ্ছে না।
শিশুকালেই হার্বাট অনাথ হন। বাবা চলচ্চিত্র নির্মাতা ললিতকুমার যখন গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান হারবার্ট বছর চারেকের শিশু। তার মা শোভারাণী খুব শিগশিরই বাপের বাড়ির ছাদে কাপড় মেলতে গিয়ে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে স্বামীকে অনুসরণ করেন। কাটাঘুড়ির গোট্টা খাওয়া দেখতে দেখতে বেঁচে যায় শিশু হারবার্ট । ঠাঁই হয় জ্যাঠা-জ্যেঠির আশ্রয়ে। অনাথ এই ছেলেটিকে এক জ্যেঠি ছাড়া ভালোবাসার কেউ ছিল না। একাকী এই শিশুর বন্ধু হয়ে উঠে বাড়ির চিলেকোঠার ছাদ। জীবনের সহজ-কঠিন নানা রকম পাঠ চিলছাদ থেকেই পায় হার্বাট। শৈশবে চিল ছাদে এসে পড়া কাটা ঘুড়ি জমানো, কৈশোরে চিল ছাদ পাশের বাড়ির কিশোরী বুকিকে লুকিয়ে দেখা, প্রবল বৃষ্টিতে চিল ছাদে আটকে পড়া কিংবা চিল ছাদে শুয়ে জ্যাঠাতো ভাই কৃষ্ণের কাছ থেকে নেওয়া লেনিনের বইয়ের প্রথম পাঠ- অনাথ হারবার্টের অনেকখানি জুড়ে চিল ছাদ।

এইভাবে হারবার্ট বড় হতে থাকে। বাপ-মা মরা ছেলেটি যে স্কুলে যায় না তা প্রথমে কেউ খেয়ায়ই করেনি। খেলাপড়ার পাঠ চুকলেও হারবার্ট কিন্তু ডানপিটে দুরন্ত নয় মোটেই। মুখ বুজে জ্যেঠাতো ভাই ধননার অত্যাচার সহ্য করে।

এ সময় হারবার্ট সংস্শর্শে আসে জ্যেঠাতো ভাই কৃষ্ণের ছেলে বিনুর। নকশালপন্থী বিনুর সুর মিলিয়ে সাথে হারবার্টও বলতে থাকে ‘পুলিশের লাঠি, ঝাঁটার কাঠি, ভয় করে না কম্যুনিস্ট পার্টি।’ বিনুর হয়ে কম্যুনিস্ট পার্টির জন্য বাহকের কাজ করলেও তাদের কেউ নয় হারবার্ট । হারবার্টের দিন কাটে তার মতো করে।

পুশিলের গুলিতে বিনুর মৃত্যুর পর স্বপ্নে বিনুর ডায়েরি খুঁজে পায় হারবার্ট । শুরু হয় তার নতুন ব্যবসা মৃতের সাথে কথপোকথন। সেই ব্যবসার জেরে অনাথ হারবার্টের জীবনে আসে কিছু সাচ্ছন্দ্য। কিন্তু হঠাৎই সব এলেমেলো করে দিলো পশ্চিম বঙ্গ যুক্তিবাদী সংঘ। তারা প্রমাণ করে ছাড়ে হারবার্টের এসব বুজরুকি ছাড়া আর কিছুই নয়। অপমানে আত্মঘাতী হয় হারবার্ট। পড়ে থাকে জ্যেঠিমার দেওয়ার জ্যাঠার পুরনো রোঁয়া ওঠা অলেস্টার, বিনুর টিউশনির টাকায় কিনে দেওয়া ফুল প্যান্ট, ধুতি, গামছা, কবিতার খাতা। রয়ে যায় একটা ফ্লপ ছবি। সেখানে কোনো পিকচার নেই, কেবল অস্ফুট শব্দ……..

নবারুণ ভট্টাচার্যকে চিনতাম উনার কবিতায়। কিন্তু উনি যে এতো শক্তিমান গল্পকার সেই পরিচয়টা জানা ছিল না। ছোট ছোট শক্তিশালী বাক্যে পাঠককে একদম কাহিনীর শেষ অবধি টেনে হওয়ার ক্ষমতা আছে উনার। আর এই ছোট ছোট বাক্যগুলোই যে পাঠকের মনের কত গভীরে দাগ কাটতে পারে তার জলজান্ত উদাহরণ আমি। হারবার্টের রোঁয়া উঠা অলেস্টার আর বিনুর দেওয়া ফুল প্যান্ট পড়ে বাইরে বের হওয়া, অলেস্টারের ছিঁড়ে যাওয়া বোতাম কুড়িয়ে পকেটে রাখা- শুধু এই দুইটা চিত্র মনে করে সন্ধ্যা থেকে যে আমি কতবার কাঁদলাম! আহারে! লোকে আলমারি ভরা জামা কাপড়ের ভীড়ে পরার জন্য কিছুই খুঁজে পায় না! বিভেদের কী নিদারুণ করুণ চিত্র!

রোঁয়া উঠা অলেস্টার আর বিনুর দেওয়া ফুল প্যান্ট হারবার্টের একমাত্র ভদ্রোচিত পোশাক এটা যতবার মনে হচ্ছিল ততবার কাঁদছিলাম। এদিকে পুত্রের বাবা বউয়ের কান্না দেখে জগতের সকল বিবাহিত পুরুষের মতো মাথা চুলকে কান্নার পেছনের নিজের অবদান আছে কী না খুঁজে যাচ্ছিলেন!!!!