02:16 AM, 13 Oct 2020
 অভিজাত কবি ও ভিক্ষুক প্রকাশক প্রসঙ্গ

রীতা খান

কোনো প্রকাশক কেন একজন কবির কবিতার বই ফ্রি প্রকাশ করবে! এর কারণ হতে পারে ১. বইটির সর্বনিম্ন ১০০-২০০ জন পাঠক আছে, অর্থাৎ ক্রেতা মিলবে!

২. বাজারে কবির সুখ্যাতি আছে; এ কারণে প্রকাশকের প্রকাশনাকর্ম ঋদ্ধ হবে; তার সৃজনশীল এ শিল্পকর্মে একটি অনন্য পালক যোগ হবে বা  ৩. কবির সঙ্গে প্রকাশকের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক; যে জন্য অনুরোধে ঢিঁকে গেলা!  এর বাইরে তো কবি কেন কারো বই-ই প্রকাশকের ফ্রি প্রকাশ করা ঠিক হবে না!  প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নিশ্চয়  কোনো স্বেচ্ছাসেবী/দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়।  তিনি অর্থ লগ্নি করবেন; সেই অর্থ থেকে মুনাফা তো দূরের কথা, মূলধনই ফেরত আসবে না- এমন ঝুঁকি সুস্থ মস্তিস্কের কেউ নেবেন না নিশ্চয়।  এমনকি যে তরুণ ফ্রি বই প্রকাশের জন্য ফেসবুকে প্রকাশক খুঁজছেন তিনি কি এই ঝুঁকিটা নেবেন!  



তরুণ এক কবি ক্ষুব্ধ হয়ে ফেসবুকে বলছেন - 'আমি একটা কবিতার বই প্রকাশ করতে চাই সেই প্রকাশনী থেকে যে প্রকাশনী ভিক্ষুকের মতো নতুন লেখকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বই ছাপায় না।  জানা থাকলে 24 ঘন্টার মধ্যে জানান এই নাম্বারে 0176...।' আপনার ক্ষোভের প্রতি সম্মান জানিয়েই বলছি; যে প্রকাশক টাকা চেয়েছেন; তিনি ভিক্ষুক নন! তিনি যেমন পুরোপুরি প্রকাশক হয়ে উঠতে পারেননি; তেমনি আপনিও কবি হয়ে উঠতে পারেননি! লেখক-প্রকাশকের সম্পর্ক হওয়া উচিত মায়ের পেটের মতো; একজনের শরীরে আঁচড় লাগলে; অন্যের শরীর থেকে রক্ত ঝরবে।  তবেই আমরা যে প্রকাশনা শিল্পের স্বপ্ন দেখি, বইবান্ধব সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখি তা পূরণ হবে।  বই আপনার (কবি/লেখকের) সন্তান; কিন্তু তাকে যত্নআত্তি করে অর্থ বিনিয়োগ; মেধা-মনন সহযোগে হাঁটাচলার সক্ষমতা (পাঠকের হাতে পৌঁছানো) দিচ্ছেন প্রকাশক।  তাই প্রকাশকের লগ্নি যেন ফিরে আসে সে ব্যাপারে কিন্তু একজন লেখক হিসেবে যথেষ্টই করার আছে আপনার।  
সেই মান্ধাতার আমলের জনপ্রিয় লেখকদের স্টাইল ছাড়তে হবে; প্রকাশক টাকা পাঠিয়ে দেবেন আপনার বাড়িতে আর আপনি এক-দু'মাস ধরে উপন্যাস লিখে তা পাঠিয়ে দেবেন প্রকাশকের দরবারে! কিংবা তরুণ কবির জুতোর তলা ক্ষয়ে যাবে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে ধর্না দিতে দিতে; অথচ পাণ্ডুলিপিটি পড়ে দেখবার সময় হবে না মাননীয় প্রকাশকের! দু'পক্ষকেই এ চর্চার বাইরে আসতে হবে।  প্রকাশককে পাঠক তৈরির পাশাপাশি লেখক তৈরিতেও দিতে হবে সংবেদনশীল-সংযোগপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে মনোযোগ।  আর লেখক বিশেষত তরুণ যারা; নতুন লিখিয়ে যারা; তাদের চর্চায় সর্বাত্মক মনোযোগের পাশাপাশি পাঠক তৈরিতেও দূরদৃষ্টি রাখতে হবে।  আপনি হয়ত কমলকুমার মজুমদার, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উল্লেখ করে বলতে পারেন; তাদের তো পাঠক কম ছিল! হ্যাঁ কম ছিল; কিন্তু একেবারেই ছিল না এমনটি কিন্তু নয়! এবং দিন যত গেছে ততই তাদের পাঠক তৈরি হয়েছে; এখনও হচ্ছে।  তাই এ কথার সঙ্গে আপনি একমত নাও হতে পারেন; তবুও জোর দিয়েই বলছি- যতই মনের আনন্দে লেখালেখি করেন না কেন; দিন শেষে কতজন পড়ল; কতজন ভালো কিংবা মন্দ বলল; সে হিসাবটা বাইরে না কষলেও অন্তরে অন্তরে ঠিকই রাখেন।  তাই আপনি লেখেন; ভালো লেখেন সেটা বন্ধু, সহকর্মী, স্বজনকে জানাতে দোষ কোথায়! তারা আপনার জানানোর ফলে সবাই বই কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়বে তেমন নয়; কিন্তু অনেকেই আবার কিনবেও।  সেই জায়গাটাই একজন প্রকাশক যদি আপনার বইয়ের একটা মুদ্রণে ১০০/২০০ কপি বিক্রির নিশ্চয়তা চান; তাতে দোষের কী! তিনি তো ফাও ফাও আপনার টাকা নিচ্ছেন না; কিংবা বই প্রকাশ করার কথা বলে তা না করেই নিচ্ছেন না।  যারা শুধু লেখেন; বই প্রকাশের সব দায় প্রকাশকের উপর চাপিয়ে দিয়ে তারাও সুবিবেচকের পরিচয় দিতে পারেন না! বইটি লেখায় যেমন আপনার একক উদ্যোগ রয়েছে, তেমনি এটি বিপণন, পাঠকমহলে সমাদৃত করবার ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ থাকতে হবে প্রকাশকের সঙ্গে।  কখনও কখনও প্রকাশককে সঠিক নির্দেশনা দিতে পারেন একজন সুলেখক।

৩.
আমাদের দেশে যে কেউ যা ইচ্ছে তাই লিখে চাইলে প্রকাশ করতে পারেন; গুণগত মানে কতটা উত্তীর্ণ তার লেখা; সেটা বিচারের ভারও কারো উপরে দিতে চান না।  টাকা আছে, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দিলেন; অমনি বই প্রকাশ হয়ে গেল! প্রকাশনা শিল্প সেভাবে বিকশিত না হবার এটাও একটা কারণ!  প্রতিটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের থাকা উচিত একটি ঋদ্ধ সম্পাদনা পর্ষদ।  যেখানে থাকবেন বাংলা ভাষা শিল্প সাহিত্য বিষয়ে অভিজ্ঞ ও ধীসম্পন্ন একাধিক ব্যক্তি।  প্রয়োজনে বিশেষ পাণ্ডুলিপির জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবার ব্যবস্থাও থাকতে হবে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের।  প্রশ্ন হচ্ছে এমন সম্পাদনা পর্ষদ কিংবা বিশেষজ্ঞ প্যানেল আমাদের দেশের কতগুলো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের রয়েছে? হাতে গোনা দু'চারটির হয়ত আছে; সেটাও কতটা কার্যকর তা বিবেচনার বিষয়।  কিন্তু এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়, এই ট্রেন্ড শুরু হয়েছে; ক্রমশ বাড়ছে এবং যারা লাইনে আসবেন না তারা একসময় ছিটকে পড়বেন।  


পুনশ্চ : আমি নিজে একসময় কবিতা লিখতাম, দু'চারটি হয়ত বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশও পেয়েছে।  এখন অনেকদিন লেখি না! তবে পড়ি এবং এই পড়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ রাখতে গিয়েই বিগত ২/৩ বছর বই প্রকাশনা ও লেখক-সাহিত্যিকদের কথা চালাচালি দেখে কিছু একটা লেখার খায়েশ জেগেছে অনেকবার! কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি, আজ ফেসবুকে তরুণ কবির আস্ফালন কিংবা আত্মরতি দেখে পুরনো সেই ইচ্ছাটা জাগল! শেষপর্যন্ত একটা কিছু লেখাও হল! যারা দীর্ঘক্ষণ সময় দিয়ে শেষ পর্যন্ত পড়েছেন, তাদের জন্য বলা- দয়া করে কষ্ট নিয়েন না মনে।  

* লেখাটির মতামত একান্তই লেখকের। তিনি যে আলোচনার সূত্রপাত করেছেন, আমরা মনে করি সংশ্লিষ্টরা যুক্তিতর্ক সহকারে এ বিষয়ে বিশদভাবে আরও লিখতে পারেন। - সম্পাদক