12:27 PM, 05 Oct 2020
সিজারিয়ানের পর বাড়তি ওজন কমবে যেভাবে

কামরুননাহার এ্যামি

সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের পর অনেক মায়েরাই মুটিয়ে যাওয়ার সমস্যার মুখোমুখি হন।

বেবি হওয়ার আগের ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে ভবিতব্য হিসেবে ধরেই নেন যে এই মেদ-ভুড়ি, অন্তত ১৫ থেকে ২০ কেজি বাড়তি ওজন আর কোমরের ব্যথা নিয়েই জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে। অথচ একটু সচেতন হলেই কিন্তু আবার ঠিক আগের মতো ফিটনেসে ফিরে যাওয়া সম্ভব।

আমিও দীর্ঘশ্বাস ফেলার দলেই ছিলাম। দীর্ঘশ্বাস গোপন করে নিজের বাড়তি ওজনকে এই বলে ডিফেন্স করতাম যে, এই মোটু আমিও কিউট, কী গোলুমুল লাগে আমাকে! সারাজীবন এভাবে কাটানোর মানসিক প্রস্তুতিও নিয়ে নিয়েছিলাম! অন্যদিকে পুত্রের বাবাও আমাকে বলতেন, ‘না ডায়েট কোরো না। দুর্বল হয়ে যাবে, অসুস্থ হয়ে যাবে।’ মানে বেচারার চিন্তা, এই একা সংসারে বউ অসুস্থ হলে তো বারোটা তারই বাজবে! তবে আমাকে আমার মা বারবার তাগাদা দিয়েছেন ওজন কমানোর। আর আম্মার পীড়াপীড়িতেই ওজন কমানোর লড়াইটা শুরু করি। ফলাফল ৬৭ কেজি থেকে ৫২ কেজি। কনসিভ করার সময় আমার ওজন ছিল ৫০ কেজি। আমার হাইট ৫ ফিট ১ ইঞ্চি। এই বাড়তি ১৫ কেজি ওজন কিন্তু একদিনে কমেনি, প্রায় বছর খানেক সময় লেগেছে।

যেভাবে আমি ওজন কমালাম : আগেই বলেছি ২০১৫ সালে কনসিভ করার সময় আমার ওজন ছিল ৫০ কেজি। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ডেলিভারির সময় ওজন ছিল ৬৩ কেজি। আমার পুত্র এক্সুসিভ ব্রেস্ট ফিড করতো। এমনকি ছয়মাসের পর থেকে বাড়তি খাবারের পাশাপাশি আড়াইবছর পর্যন্ত ওকে বুকের দুধই দিয়েছি। বাইরের অন্যকোনো দুধ দেইনি। পুত্রের যখন ১০/১৫ দিন তখন হঠাৎ করে মনে হলো ও দুধ পাচ্ছে না। তাই ও যেন পর্যাপ্ত দুধ পায় সেটা নিশ্চিত করতে গিয়ে আমি নিজে খেয়েছি বেশি করে।২০১৭ সালের মাঝামাঝি পুত্রের যখন দেড় বছর তখন আমার ওজন কমে হয়েছিল ৫৭ কেজি। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দেখি ওজন বেড়ে ৬৭! আমার তো মাথায় বাজ! তখন ছেলেও বুকের দুধ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। ছেলে পেটে থাকতে আর ওকে দুধ খাওয়ানোর সময় আর আগের কিছু কাজা রোজা মিলে আমার প্রায় ৬০টা রোজা কাজা পড়ে গেছিল। তাই সিধান্ত নিলাম রোজাগুলো একটানা রাখবো। আমি ২০১৯ সালের নভেম্বর থেকে পিরিয়ডের দিন বাদে টানা দুইমাস রোজা রেখেছি। শুধু ইফতারে একবার খেয়েছি। এর পর জানুয়ারিতে আমার ওজন হয় ৫৬ কেজি। দুইমাসে কাজা রোজাগুলো শেষ হয়ে যায়। আর বাকি ৪ কেজি ওজন কমাতে শুরু হয় আমার আসল লড়াই।২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে আমি ব্যালান্স ডায়েট শুরু করি। জুলাইতে গিয়ে আমার ওজন আসে ৫২ সাড়ে ৫২ কেজিতে। আর এখন ওই ব্যালান্স ডায়েট আর ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম করেই ওজন ধরে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।

আমি যা খেয়েছি

*রোজা রেখে আমি কিটো+ওমাড ডায়েট ফলো করেছি।মানে একবেলা খেয়েছি। ইফতারে ডিম, বাদাম, সবজি, সালাদ আর সাথে অল্প মাছ মাংস খেয়েছি। সেহেরিতে শুধু পানি।

* ব্যালান্স ডায়েটে আমি মূলত লো-কার্ব ফলো করেছি এবং এখন লো-কার্ব ফলো করি। সকালে একটা রুটি, একটা ডিম, সবজি খাই। মিড মর্নিংয়ে একটা টক ফল। দুপুরে খাই অল্প ভাত, অনেক সবজি, সালাদ আর অল্প মাছ কিংবা মাংস। বিকেলে ৫০ গ্রামের মতো চীনা বাদাম অথবা ৭/৮টা কাজু কিংবা কাঠ বাদাম। রাতে সালাদ আর টক দই। রাতের খাবার সাড়ে ৭টার মধ্যে শেষ করি।

প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় যোগ করেছি

*বাদাম

* সালাদ

* শাক-সবজি

*টক দই

খাদ্য তালিকা থেকে যা একেবারে বাদ দিয়েছি

*দুধ চা : আগে এককাপ ঘন করে বেশি চিনি দেওয়া দুধ চা ছাড়া আমার চলতো না। এমনকি মন খারাপ হলে কিংবা ভালো হলে কারণে অকারণে দুধ চা খেতাম। এখন দুধ চা একেবারে বাদ। মজার ব্যাপার হলো দুধ চা আর আমার ভালোও লাগে না। না খেতে খেতে অভ্যাস হয়ে গেছে। হঠাৎ ঠেকে পড়ে খেলে বিস্বাদ লাগে।

* চিনি : চা কিংবা কফি ছাড়া আমার চলত না আগে। কিন্তু এই চা কিংবা কফিতে চিনি একদমই বাদ দিয়ে দিয়েছি। এখন কফিতে চিনি দিলেই বরং খেতে পারি না। গ্রিন টি কিংবা র চায়ে হাফ চা চামচ মধু দিয়ে খাই। আর আমি চিনির কোনো যেমন জিরোক্যাল, স্টেভিয়া কিংবা খেজুরের চিনি ইত্যাদিও খাই না।

* বাইরের খাবার : বাইরের প্যাকেটজাত ও বোতলজাত খাবার যেমন, পাউরুটি, বিস্কুট,চানাচুর, কোমল পানীয় কিংবা রেস্টুরেন্টের খাবার পিজ্জা, পাস্তা, ফ্রাইড রাইস, কেক,পেস্ট্রি, বিরিয়ানি,হালিম,তেহেরি,মোঘলাই,ডাল পুরি,ভেলপুরি,চটপটি, ফুসকা ইত্যাদি ইত্যাদি পুত্র হওয়ার পর খুব একটা খেতাম না। আর এখন এসরের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করেছি। চেষ্টা করি বাসায় বানিয়ে চেষ্টা করি স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়ার।

ব্যায়ামে অবহেলা নয়

একটু একট্রিম ডায়েট করে হয়তো ওজন কমানো সম্ভব। কিন্তু সেটা ধরে রাখাটা একটা চ্যালেঞ্জ। আর এখানে একটা বিষয় বলে নেই, আমি যেহেতু বাসায় থাকি আর ঘরদোর সামলানোর ফাঁকে ফাঁকে ফ্রি ল্যান্সিংও করি তাই আমাকে দিনের বেশ কিছুটা সময় ল্যাপটপের সামনে বসে কাটাতে হয়। তাই আমার জন্য চ্যালেঞ্জটা আরো শক্ত।

তবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছি আমি প্রতিদিন অন্তত আধ ঘণ্টা থেকে ৪৫ মিনিট ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম করে। যখন আমার ওজন ৫৬ কেজিতে আসে তখন থেকে আমি চেষ্টা করি প্রতিদিন ব্যায়াম করার। এছাড়া তিনজনের সংসারের বাসার ভেতরের ৭০ ভাগ কাজ আমি করি। বাকি ৩০ ভাগ পুত্রের বাবা করে। আর বাইরের কাজ ৭০ ভাগ পুত্রের বাবা করে ৩০ ভাগ আমি করি। আমাদের কোনো হেল্পিং হ্যান্ড নেই।তাই ঘর মোছার কাজটা আমার জন্য একটা ভালো ব্যায়াম হিসেবে কাজ করেছে।

চিট ডে

হ্যাঁ, ওজন কমানোর চক্করে নিজের চিত্তকে পুরোপুরি অসন্তুষ্ট করতে আমি রাজি নই। তাই সপ্তাহে অন্তত একদিন দুপুরে ভরপেট খাই। ওইদিন মাঝে মাঝে একটু মিষ্টি জাতীয় খাবারও খাই। তবে এই চিট আমি আমার কাঙ্খিত ওজনে পৌঁছানোর পর থেকে করি।

এই ছিল আবার ওজন কমানোর লড়াইয়ের গল্প। তবে আমি যেভাবে কমিয়েছি যেটা কিন্তু সবার জন্য অবশ্যই প্রযোজ্য নয়। কারণ ওজন কমানো কিংবা বাড়ানো মূলত নির্ভর করে ব্যক্তি বিশেষের বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, মেটাবলিজন, হরমোন ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের উপর। আমার নিজের অভিজ্ঞতা বিস্তারিত বয়ানের উদ্দেশ্য হলো মূলত আমার মতো যেসব মায়েরা ওজন কমানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন তাদের অনুপ্রেরণা দেওয়া। কারণ নিজেকে ভালোবাসলে, নিজে ভালো থাকলেই আমরা চারপাশের সবাইকে আরো ভালোভাবে ভালোবাসতে পারি, তাই না?

কামরুননাহার এ্যামি : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক