11:05 AM, 18 Sep 2020
সুন্দর তুমি এসেছিলে

[দুর্দান্ত এক কথার কারিগর মোস্তফা সোহেল ১২ আগস্ট লোকান্তরিত হয়েছেন, তার স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।]

এক 
 
নবনী’র সুইসাইড করার সংবাদটা জানার পর আমার সকালটা আরো বিষন্ন আর নস্টালজিক হয়ে ওঠে।
আমার সাথে বছরখানিক আগেই সেপারেশন হয়েছিল তার। লাল কৃষ্ণচূড়া ফুটে থাকা অফহোয়াইট রঙের আটতলা এপার্টমেন্টের টপ ফ্লোরে থাকতো নবনী । সেগুনবাগিচায়। একা। মাঝে মাঝে খুব রাতে মদ-টদ  খেয়ে যখন একটু উন্মাতাল হয়ে যাই, তখন আমার শ্যামলীর বাসায় না ফিরে সেগুনবাগিচায় চলে আসি। আলো আঁধারের ভেতর একটা হলুদ রঙের ডোরাকাটা নাইটি পড়ে নিরীহ দৃষ্টিতে সামনে আসে নবনী। আমি তখন দুরন্ত বাতাসে কথার তুবড়ি ছুটিয়ে দেই প্রেমবাজ ঘোড়ার মতো।
‘কি হলুদ পাখি ঘুমির ডিসটাব করলাম নাকি ?’
হলুদ পাখি আড়মোড়া ভাঙে। আমাকে এভাবে দেখে একটু অবাক হয়। তবু ঠোঁটের এককোণে হয়তো বিজয়ের হাসি। আমি সেটা টের পাবার আগেই সে বলে,
তুমার সাহস তো কম না । এই ভর রাত্তিরে আমারে জ্বালাতি আইছো! ভালোয় ভালোয় কাইটে পড়ো। তা না হলে কলাম ঘাড় ধইরে বাইর করে দিবানি।
আমি এইরকম গভীর রাতে ফুটে থাকা লাল কৃষ্ণচূড়াগুলোর দিকে তাকাই। কার্নিশের উপরে টবের ভেতরে ফুটে আছে বোগেনভেলিয়া। আর অন্য পাশে ফুটে আছে হলুদ রঙের এলমন্ডা। একটা চমৎকার গন্ধ বাতাসে উড়ে বেড়ায় তখন। নেশাটা কিরকম গাঢ় হয়ে আসে। 
একটু করুণ কণ্ঠে বলি, এতো যে বাজে কথা কও আমারে। তবু আমার গায়ে লাগে না। একবছর হয়ে গেছে তুমি আলাদা থাকতিছ । তুমি আমারে ধরোও না। আবার ছাড়ো ও না। ক্যান জানতি পারি?
আমিতো তুমারে স্বাধীন কইরে দিছি ,যা মন চায় করো। দোহাই লাগে আমারে আর রাত-বিরেতে এইরাম ডিস্টার্ব কইরো না। সকালে আমার অফিস থাকে।
কিরাম অফিসে যাও তুমি, আমার জানা আছে। কার সাথে ঢলাঢলি করো তাও জানি! ঘুঘু দেইখেছো, ঘুঘুর ফাঁদ দেখোনি!
ছিঃ তুমি এখনও যা তা। রাস্তার লোক! বলেই আমাকে ধাক্কা মেরে বাইরে এনে দরোজাটা খটাস করে বন্ধ করে দেয় নবনী। 
আমি তখন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি বন্ধ দরজার দিকে। নেশাটা একদম কেটে গেছে ততক্ষণে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি তিনটে বাজে । বাইরে দারোয়ান কিরকম একটা টেনশন নিয়ে অপেক্ষা করছে। আমি তার দিকে একটা একশো টাকার নোট ছুঁড়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ি।

নবনীর সাথে যে সর্বদা আমার এইরকম তিক্ত সম্পর্ক ছিলো- সেরকম সিদ্ধান্তে আপনারা এখনই পৌঁছবেন না দয়া করে। একটা ঘটনার কথা বলি। নবনী আর আমি, বিয়ের ঠিক এক বছরের মাথায় সেন্ট মার্টিন দ্বীপে যাই। টেকনাফ থেকে বড় জাহাজগুলি যাত্রী নিয়ে সেন্ট মার্টিনের দিকে যায়। আমরা উঠে পড়লাম সেই জাহাজে। দুজনেই নদীর দিকে তাকিয়ে, নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজেদেরকে যখন প্রকৃতির কাছে সমর্পণ করেছি, মনের ভেতরে একটু একটু করে সকালের কমলা রঙা রোদের মতো উঁকি দিচ্ছে হেলাল হাফিজের কবিতা। 
‘তোমাকে শুধু তোমাকে চাই, পাবো?/পাই বা না পাই এক জীবনে তোমার কাছেই যাবো।' আমার আবৃত্তি শুনে আবেগে নবনী কেঁদে ফেললো। আমাকে হুট করে জড়িয়ে ধরে বললো, জীবনে কোনোদিন কাউরে এতো ভালোবাসিনি সুনা! আমারে ছাইরে চইলে যাবা নাতো? কথা দিতি হবে কলাম!
আমি তখন প্রকতির সাথে, সমুদ্রের গর্জনের সাথে নিবিড় হয়ে উড়ে যাচ্ছি। আকাশে দলবেঁধে উড়ছে ফ্রিগেট পাখি। আমাদের জাহাজের পিছু নিয়েছে তারা। আমি সেইসব অভ্যর্থনাকারীদের দিকে তাকিয়ে জোরে আরো জোরে নবনীকে জড়িয়ে ধরি, হেসে বলি, কক্ষনো না। কোনোদিনই তুমারে ছাইরে যাবো নারে সুনা।
আমরা অন্ধকার রাতে সমুদ্রের পাড়ে বসে থেকেছি পরস্পর। সন্ধ্যায় আমার খিদে পায় বলে নবনী কখন যে কয়েকটা ‌‌ফিস ফ্রাই নিয়ে এলো একেবারে টাটকা ভেজে। আমি উৎফুল্ল হয়ে সেই মাছ দিয়ে রাতের খাবার খাই। রাত বাড়ার সাথে সাথে সমুদ্রের গর্জন যেন আরো বাড়তে থাকে। আশেপাশের লোকগুলোও কোথায় উধাও হয়ে যায়। 
আমি বললাম নবনী,  হোটেলে যাবা না?    
নবনী  তখন নীরেন্দ্র চক্রবর্তীর প্রেমের কবিতা পড়ে ফিসফিস করে। 
ও নদী, ও রহস্যময় নদী,
অন্ধকারে হারিয়ে যাসনে, একটু দাঁড়া;
এই যে একটু-একটু আলো, এই যে ছায়া ফিকে-ফিকে,
এরই মধ্যে দেখে নেব সন্ধ্যাবেলার প্রথম তারাটিকে।
কি যে দারুণ আবৃত্তি করতো নবনী! এখনও যেন সেসব কবিতা মগজের ভেতরে লুটোপুটি খায়। আসলে সেসব সুন্দর মুহূর্তগুলো কখন যে অর্থহীন হতে শুরু করেছে আমার  মনে নেই। তবে আমার বন্ধু মইনুল যেদিন প্রথম বাড়িতে এলো সেদিন বেশ হুলুস্থুল হয়েছিলো। ঝামেলার সূত্রপাতও সেখান থেকে অথবা অন্য কিছুও হতে পারে। আমি ঠিকঠাক বুঝতে পারি নাই। মইনুল বাসায় ঢোকার সময় একটা ছোট্ট নীল বোতল তুলে বলেছিলো, ধর দোস্ত টাকিলা! 

আমি মাথা ঝুঁকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বোতলটা দেখি। ফিসফিস করে বলি, এইডে আবার কি আনিছিস!
মইনুল হাসে। দোস্ত এইটা হইলো টাকিলা গোল্ড। তবে আরো নানা ধরনের ব্র্যান্ড তুই পাবি; যেমন ধর টাকিলা সানরাইজ, ক্যাকটাস, বর্ডার ক্রসিং, ক্যালিফোর্নিয়া স্কাই, ডিভাইন প্লেজার, দি এক্সপ্লোরার, গালফ অব মেক্সিকো, লা বোম্বা, মাফিয়া, নিউইয়র্ক স্কাই লাইন ইত্যাদি...!
ওরে বাবা। তুই ইরাম করে কচ্ছিস মনে হচ্চে ইডা খুব দামি জিনিস!

মইনুল হাসে। কর্পোরেট হাসি। একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির ব্র্যান্ড ডিরেক্টর সে। আমি মাঝে মাঝে ওর কাছ থেকে ধার টার নেই। আমার দুঃসময়ের বন্ধু ভাবি ওকে। খুব মনোযোগ দিয়ে ওর কথা শোনার ভান করি। মইনুল যেন কিরকম বুদ্ধিজীবীর মতো আচরণ করে। শোন দোস্ত। তুই তো ফ্রিল্যান্সার! ব্যবসার পাশাপাশি লেখালেখিও করিস!  রবীন্দ্রনাথের  ভক্ত।  কনটেক্সট বুঝিস?
আমি মাথা নাড়ি।
কনটেক্সট হলো নির্দিষ্ট ঘটনার চারপাশে আর যা কিছু ঘটে তাই! আমাদের মস্তিষ্কে স্মৃতিগুলোর বিন্যস্তকরণে এবং উদ্ধার প্রক্রিয়ায় এই কনটেক্সট এর একটা বিশাল ভূমিকা আছে । যেমন ধর, তোর জীবনে যদি কখনও কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে তাহলে কয়েক পেগ টাকিলা খাওয়ার পর তোর সেই বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়তে পারে।
বলিস কি?
হুম। আবার ধর যারা অনেক বেশি সিরিয়াস ডিসট্রেসিং ইভেন্ট বা গভীর পীড়াদায়ক ঘটনার স্মৃতি বয়ে বেড়ান তাদের কখনও কখনও পোস্ট ট্রমেটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার হয়। কিন্তু কিছু কনটেক্সচুয়াল ইঙ্গিত তাদেরকে এই বেদনাদায়ক স্মৃতি থেকে মুক্তি দিতে পারে। টাকিলা পান করলে সেই কনটেক্স থেকে স্মৃতিগুলোকে আলাদা করতে পারবি।
আমি মুগ্ধ হয়ে ওর কথা শুনি। বলি, এখনই বাইর কর। খাইয়ে ফেলি।
মইনুল হাসে। আমি ওর ইশারা বুঝি। দুটো গ্লাস আনি। সাথে ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা পানির বোতল। নবনী একটা সাদা রঙের চিনেমাটির বাটিতে স্লাইস করে কেটে দেয় লেবু। মইনুল হেসে বলে, দুটো গ্লাস এনেছিস ক্যান রে বোকা! তিনটে নিয়ে আয়।
আমি প্রশ্ন করলাম, ক্যান দোস্ত?
মইনুল বিরক্তিভরা দৃষ্টিতে বললো, ভাবি খাবে না? ভাবিও পার্টিসিপেট করুক না। অসুবিধা কি ?
 
আমি নবনীর ব্যাপারটা ভাবিই নি। জিভ কেটে শুদ্ধ ভাষায় বলি, ওহ ভুল হয়ে গেছে দোস্ত। 
নবনী খাবে নাকি একটু!
নবনী প্রথমে না সূচক মাথা নাড়ায়। ড্রইং রুমে বসে কি একটা সিনেমা দেখছিলো সে। মইনুল হেসে বললো, নবনী ভাবি প্লিজ আসো না!
নবনীও তখন হালকা মেজাজে, না ভাইয়া আপনারা এনজয় করেন না প্লিজ। আমি আসলে  নেটফ্লিক্সে একটা মুভি দেখছি।
আমার মন ভালো হয়ে যায়। মনে হয় এসব আপাত নিষিদ্ধ জিনিষের প্রতি ওর আগ্রহ কম। কিন্তু মইনুল কিরকম একটা ঈশারা করে ডাকার পর পরই নবনী এসে বসে ওখানে। তারপর তিনজন মিলে আমরা পান করতে থাকি টাকিলা। মইনুল বেশ যত্ন করে সবার গ্লাসে ঢেলে দিচ্ছিলো। খুব রাতে আমি যখন খানিকটা বিভোর, হেসে নবনীকে প্রশ্ন করলাম, কিরাম লাইগতেসে!
ভালো। তবে মাথাটা কিরকম ঝিম ঝিম করছে। ঘুম আসছে। একটা সমুদ্রের  মধ্যে যেন আমি নীল তিমি মাছের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি।
তাই নাকি?
হুম। আবার ধরো কখনও কখনও ঘুড়ি হয়ে আকাশের ওই চাঁদটাকে ছুঁতে ইচ্ছে করছে। 
আমি  হতাশ  হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে  থাকি। আসলে আমরা দুজনে একসাথে থাকলে সবসময় আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলি। মইনুল এসে সবকিছু ওলোটপালোট করে দিয়েছে। এরই মধ্যে নবনীর কি যে হলো আমাকে ইশারায় অন্য রুমে যেতে বললো। আমি খানিকটা অবাক। টাকিলার কোনো বিশেষ কিছু আমার অনুভূতিকে স্পর্শ করলো না! তবু আমি দ্বিধাগ্রস্ত। খানিকটা চিন্তিত মুখে পাশের রুমে গিয়ে দেখি নবনী ফ্লাট হয়ে শুয়ে পড়েছে  বিছানায়। আমাকে দেখেই হাত দুটো বাড়িয়ে দেয় সে। আমিও ঘোরের মধ্যে তাকে চুমু খাই। আদর করি। কবিতা শোনাই
যখন আমার স্বপ্ন লুট হয়ে যায়
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়,
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়!
নবনি বলে , বাহ্ বাহ্ দারুণ। আমাকে এখন আদর করো। প্রচণ্ড আদর করো।
আমি নিজেকে শান্ত রাখি। ফিসফিস করে বলি, মইনুল ওপাশে বসে আছে। একা। বেচারা কি ভাববে!
ডেকে আনো না মইনুল ভাইকে। হি ইজ সো সুইট। লেটস হ্যাভ এ গ্রুপ জার্নি 
কিসব কথা কচ্চ তুমি। ইডা কিরাম কথা!
আরে ডাকোনা! নাকি আমি ডাকবো!
আমি খানিকটা পাথরের মতো হয়ে গেলাম। ওখান থেকে বেরিয়ে মইনুলকে ঘরের ভেতরে রেখেই ছাদের উপর চলে আসি। এসে সিগ্রেট ধরাই। রেলিঙে ভর করে অনেকক্ষণ একা একা সকালের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। ভোরের দিকে যখন একটু একটু রোদ উঠেছে মইনুল ছাদে এলো, কি হয়েছে দোস্ত। তুই ছাদে এসে বসে আছিস কেন?
আমি অনেকটা উদভ্রান্তের মতো ওর কলার দুটো ধরে বললাম- 
ওই শালা মান্দার পুত। আমারে আবাল পাইয়ে যা ইচ্ছে কইরে বেড়াচ্ছ
দোস্ত তুই এগুলা কি বলতেছিস
চুতমারানির পোলা, এখুনি বাইরো আমার বাড়ির থেইকে
দোস্ত কারে কি বলতিছিস
ধোর ব্যাটা। বাইরো!

মইনুল ম্লান মুখে ঘরের ভেতরে চলে যায়। আমি তাকে মাথা নিচু করে বাড়ির বাইরে যেতে দেখি। সূর্যের তাপ বাড়তে থাকে, আমিও আস্তে আস্তে ঘরের ভেতরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ি। ভাবি- সত্যি কি তবে ভালোবাসা প্রকাশে কোনো ঘাটতি আছে আমার? নিজেকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখি। 
মনে মনে ভাবি মনিরামপুরের সেই বারেক মোল্লা আমি। পুরো গ্রামের মধ্যে একমাত্র মাস্টার্স পাশ। আমার বাবা হোসেন মোল্লা। রাখিমালের ব্যবসা করতেন। লম্বা সুদর্শন এক মানুষ। বিকেলবেলা বাড়ি থেকে প্রায় আমি কাউকে কিছু না বলে বাবার দোকানে চুপচাপ গিয়ে বসে থাকতাম। আর বাবা মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে একটু ঘনিষ্ট হয়ে আমার কপালে চুমু খেতেন। তারপর কাউকে পাঠাতেন দেবুর দোকানে গুড়ের সন্দেশ আনতে। সেইতো আমার ভালোবাসার প্রথম পাঠ। সেই শৈশব থেকে যাদেরকে ভালোবেসেছি, তাই মন-প্রাণ উজাড় করে দিয়েছি। বাবার মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত  আমি তাঁর  হাত  সবসময় শক্ত  করে ধরে রেখেছি। আমার ভালোবাসায় কখনো কনফিউশন নেই। কোনো সন্দেহ নেই।
তবু এই নবনীর আচরণ, সেদিন রাতে সেক্স নিয়ে একটা অসহ্য রকমের বাড়াবাড়ি আমাকে প্রায় উন্মত্ত করে তোলে। এরকম চাহিদা মানেতো সে আমাদের দৈহিক সম্পর্কের বিষয় নিয়েও সুখী না। নাকি এখনই মিডলাইফ ক্রাইসিসে ভুগছে সে। কোনোকিছুতেই আর সন্তুষ্টি  নেই? তা না হলে ওই রাত-বিরাতে গ্রুপ সেক্সের কথা উঠবে কেন? তবে কি লেডি চ্যাটার্লিজ লাভারের মতো তার জীবনেও ঘটছে এক আশ্চর্য ঘটনা! শহরের ধনী কিন্তু পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামী ক্লিফোর্ড চ্যাটার্লির কাছে পার্থিব জৌলুসের সব পেয়েও একজন স্ত্রীর যে আরো কিছু চাহিদা থাকে তা পূরনের বর্ণনা ছিলো সেই উপন্যাসে। যুদ্ধের আঘাতে নিম্নাঙ্গের পক্ষাঘাত নিয়ে ক্লিফোর্ড চ্যাটার্লি দেহগত সুখ যেমন দিতে পারেননি স্ত্রী কন্সট্যান্স চ্যাটার্লি (লেডি চ্যাটার্লি) কে তেমনই মনোগত সুখ দিতেও ছিলো তার কার্পণ্য! 
এই সঙ্কটই লেডি চ্যাটার্লিকে ঠেলে দিয়েছিলো সর্বনাশের দিকে। শরীরের সুখ পেতে তিনি ক্ষণিকের জন্যে বেছে নিয়েছিলেন ক্লিফোর্ড স্টেটের কর্মচারি অলিভার মেলর্সকে । আর সেখান থেকেই শুরু। জীবনের আকাঙ্খিত সুখটুকু ভোগ করেছেন অলিভার মেলর্সের কাছ থেকে । 
উপলব্ধি করেছেন সব মানুষের জীবনের পরম সত্যটি ; শুধু মন নিয়ে বেঁচে থাকা যায়না, চাই দেহগত সতেজতাও । সম্ভোগের উত্তুঙ্গ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছেন, শুধু মানসিক নৈকট্য নয় ভালোবাসা হতে পারে দেহের ভালোবাসা থেকেও।
তাহলে কি এইরকম একটি বিভ্রমের মধ্যে পড়েছে নবনী? এটা কি বাস্তবতা নাকি বিভ্রম?
ততক্ষণে কাছে এসেছে আবার নবনী। কি হলো একটা সামান্য ইয়ার্কিও বোঝো না তুমি  অরণ্য!
ইয়ার্কি?
অফকোর্স। তুমি কি করে ভাবলে আমি ঐটা সত্যি সত্যি চাই? কথাটা শুনেই কিরকম ক্ষেপে গেলে? তার মানে কি তোমার সাথে কোনো কিছুই শেয়ার করতে পারবো না আমি!
না মানে আসলে 
বুঝেছি যতো দোষ আসলে ওই টাকিলার
ঠিক বলেছো। টাকিলাই আমাদের কনটেক্সটাকে আলাদা করতে হেল্প করেছে। অভ্যস্ত নই বলে মিস হ্যান্ডেলড হয়েছে
হতে পারে। তার মানে টাকিলা উইল নট বি এলাউড এনিমোর এট আওয়ার হাউস
আমরা দুজনেই হাত তুলে বললাম- ইয়েস! এন্ডোর্সড!

সেদিন অনেকদিন পর নবনী আর আমি দিনভর সারা ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াই। ইউনিভার্সিটি, পাবলিক লাইব্রেরি, শাহবাগ, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র হয়ে ধানমন্ডিতে ওর প্রিয় রেস্টরেন্টে  লাঞ্চ। নবনী  সারাক্ষণ আমার একটা হাত লতার মতো জড়িয়ে থাকে। ফিসফিস করে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে।  
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে
রয়েছ নয়নে নয়নে,
হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে
হৃদয়ে রয়েছ গোপনে।
আমি হেসে বললাম, এমন ভেঙে চুরে ভালো কেউ বাসেনি আগে!
নবনী হেসে আমার কাঁধে মাথা রাখে।  আলতো করে চুলের বিনুনি খোলে। ধূমায়িত কফির কাপে চুমুক দেয় একবার। বলে, আর কখনও ভুল বুঝো না আমাকে অরণ্য। 

আমি  ওর হাত ছুঁয়ে বলি, না।  আর কখনও না। 
তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে নবনী ওর প্রিয় কবিতাটি পড়ে। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকি। 
তুমি কাল জাগালে, গভীর রাত্তিরে ঘুম থেকে তুলে প্রেমের কথা শোনালে,
মনে হয়েছিল যেন স্বপ্ন দেখছি
স্বপ্নই তো, এ তো একরকম স্বপ্নই,
আমাকে কেউ এমন করে ভালোবাসার কথা বলেনি আগে,
ঘুমের মেয়েকে এভাবে জাগিয়ে কেউ চুমু খেতে চায়নি
আমাকে এত আশ্চর্য সুন্দর শব্দগুচ্ছ কেউ শোনায়নি কোনওদিন
এত প্রেম কেউ দেয়নি,
এমন ভেঙে চুরে ভালো কেউ বাসেনি।
তুমি এত প্রেমিক কী করে হলে!
কী করে এত বড় প্রেমিক হলে তুমি? এত প্রেম কেন জানো? শেখালো কে?

আমি ওর কবিতা শুনে কিরকম সুখের ভেতরে ডুবে যাই । যেনো মগ্ন চৈতন্যে প্রিয় ভালোবাসার শীষ শুনতে থাকি রোজ।  তুমুল আনন্দের করতালি  বাজে চোখের পাতায়।  আমি রেস্টুরেন্ট ভর্তি লোকের সামনেই গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরি নবনীকে।  নবনী তখন শিশুর মতো আমার বুকের উত্তাপের ভেতর হারাতে থাকে বিকেলের  রোদের মতো। 

এইভাবে আমাদের প্রথম পর্বের ভুল বোঝাবুঝি শেষ হয়েছিল।
পরের পর্বে কী ছিল তা জানতে হল সদ্য প্রয়াত কথাসাহিত্যিক মোস্তফা সোহেলের সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস সুন্দর তুমি এসেছিলে (ফেব্রুয়ারি ২০২০) পড়তে হবে। 
উপন্যাস : সুন্দর তুমি এসেছিলে   
প্রকাশক : বাংলানামা
মুদ্রিত মূল্য : 
২০০ টাকা