03:42 PM, 11 Sep 2020
চলতি পথের দিনলিপি

রুহুল আমিন

কাটাবনের যাত্রী ছাউনিতে বসে মার সাথে ফোনে কথা বলছি। একটু রেগে রেগেই কথা বলছিলাম। কারণ ডাক্তার বলে একরকমভাবে ওষুধ সেবন করতে, আর মা ওষুধ সেবন করে নিজের মতো করে।


 অনেক সময় মনে হয় ডাক্তারের চেয়ে বেশি বুঝেন মা! তাই রেগে রেগে কথা বলছি। কথা বলা শেষ করতেই দেখি একটি মেয়ে আমাকে বলছে, মায়ের সাথে এভাবে কথা বললেন? হ্যাঁ। এভাবে কথা বলবেন না। মায়েরা কখনো ভুল করে না। সন্তানরা ভুল করে থাকতে পারে। আমি এটাতে ভুলের কিছু দেখছি না। ডাক্তারের পরামর্শ নিলে ডাক্তার যেভাবে বলবেন সেভাবেই চলতে হবে। কিন্তু মা তা করছে না। নিজের মতো করে ওষুধ নিচ্ছেন। ওনার যেভাবে ভাললাগে সেভাবেই থাকতে দেন। নিশ্চয় বয়স হয়েছে। তাই যতদিন বেঁচে থাকে নিজের মতো করেই বাঁচতে দিন। প্রথমে একটু বিব্রতবোধ করলাম। চিনি না জানি না গায়ে পড়ে জ্ঞান দিচ্ছে। ভাল লাগছে না। বিরক্তিটা ভাঙলেন তিনি। নাম বললেন-জাহানারা মিশু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে মার্স্টার্সের শেষ বছর। আমিও ভদ্রতা বসত আমার পরিচয় দিলাম। পরে আরো কথা হলো। শেষে ফোন নাম্বারও বিনিময় হলো। মায়ের প্রসঙ্গ থেকে দূরে গিয়ে অনেক বিষয়ে কথাও হলো সেদিন। বছর খানেক হলো মিশুর সাথে আমার নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। বলা যায় খুব কাছের বন্ধু হয়ে গেলাম আমরা। আমার দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ায় ও। আমিও তার দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। ওর সবচেয়ে যে দিকটা ভাল লাগে তা হলো, কোনো ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকতা করে না। সময়ের দাবি মত চলে সে। ওর সবচেয়ে খারাপ দিনগুলোতেই বোধহয় আমার সাথে পরিচয় হয়েছিল। প্রায়ই ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করতো। বন্ধুত্বের অনেক দিন পর জেনেছিলাম কেনো সে মায়ের সাথে রেগে কথা বলা পছন্দ করেনি সেদিন।

মিশু ভালোবেসে একা একা বিয়ে করেছিল খালাত ভাইকে। তখন অর্নাস ফাইনাল ইয়ারে। বাবা নেই। মার শত নিষেধ স্বত্বেও বিয়ে করেছিল। পরিবার ছাড়াই বিয়ে বলা চলে। পড়াশোনা করেনি ছেলেটি। ইন্টারমিডিয়েট পাস। বেকার। তারপরও মিশু মার অমতে বিয়ে করেছিল। ভেবেছিল নিজে চাকরি করলে সব ঠিক হয়ে যাবে। অন্তত ভালোবাসার মানুষটা কাছে থাকবে তো। মিশু পারেনি শেষ পর্যন্ত। পরে জেনেছিলাম ছাড়াছাড়ি হওয়ার কয়েকদিন পরই আমার সাথে তার দেখা হয়েছিল। আর ওই সময়টাতে মায়ের কথা অমান্য করার ব্যাপারটি হয়তো তাকে যন্ত্রনা দিচ্ছিল বেশি বেশি। তাই মায়ের সাথে রাগ তার পছন্দ হয়নি। তাই গায়ে পড়ে কথা বলেছে। মিশু মায়ের ব্যাপারে খুব সিরিয়াস। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ মায়ের কথা মতো চলে এখন। আমার সাথে যতবারই কথা হয় মার খোঁজ খবর নেয়। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, এই স্বপ্নখোর নিয়নমাখা শহরে একজন ভাল বন্ধু পাওয়া খুব ভাগ্যের ব্যাপার। মিশুর সাথে দেখা হওয়াটা সত্যিই অনেক ভাগ্যের ব্যাপার।

গতকাল মিশু একটি প্রাইভেট ব্যাংকে জয়েন করেছে। যেদিন জয়েনিং লেটার পেয়েছিল সেদিন ফোন দিয়ে বলেছিলো আমার চাকরির প্রথম খবরটা তোকে দিলাম। খুব ভাল লেগেছিল ওর খবরটা শুনে। সেদিন বললাম এবার ভাল একটা ছেলে দেখে বিয়ে করে পুরোদস্তর সংসারী হয়ে যা। ওই কথার প্রতিউত্তর শুনেছি কয়েকদিন হয়েছে। কিন্তু এখনো আমার কানে পারদের মতো বিদ্ধ হয় সেই শব্দগুলো। ও শুধু বলেছিল, আমাকে আর এ কথা বলিস না। এটলিস্ট কেউ আমাকে ঠকাক আমি তা চাই না। কেউ আমার সাথে প্রতারণা করুক এটা আমি চাই না। বেশ আছি, ভালো আছি। মা আছে, তোরা আছিস, ভাল আছি। জীবন শান্তিতে আছে। কেউ তো আর ঠকাতে পারবে না।

জানি না বন্ধুর এমন ধারণা কোনোদিন পরিবর্তন হবে কি না। তবু বন্ধু তো। কষ্ট লাগে। কারণ তার কষ্টের কিছুটা উত্তাপ হলেও আমি পেয়েছি কখনো সখনো। ওর কান্না, ওর মন খারাপ, ওর ভেঙে পড়া। কতকিছু চোখের সামনে ঘটেছে। সত্যিই ও ঠকেছে ভালোবেসে। তারপরও ওকে বলেছি পারলে ভেবে দেখিস সিদ্ধান্ত বদলাতে পারিস কি না। একা একা কয়দিনই বাঁচতে পারবি। কাউকে না কাউকে তো আবার বিশ্বাস করতেই হবে। হয় তো আবার ঠকতে পারিস, কিন্তু এটাই তো জীবন। এখানেই তো জীবনের সীমাবদ্ধতা, জীবনের সার্থকতা। মিশু শুধু আমার কথা শুনে যায়, প্রতি উত্তর দেয় না। আমিও অপেক্ষা করি না। ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাবে এটাই স্বাভাবিক। বন্ধুর পাশে আছি সব সময়। নতুন চাকরিতে বন্ধু ভাল করবে, অনেকদূর এগিয়ে যাবে এই প্রত্যাশা রইল তার জন্য।

বন্ধুর জন্য আমার কষ্ট হয়, খারাপ লাগে। ভাবি সত্যিই কেউ কেউ ঠকে যায় ভালোবেসে। যদিও ভালোবাসায় ঠকা জেতা বলে কোনোকিছু নেই। তবুও হিসাব তো করতে হয় মাঝে মাঝে.....