01:54 PM, 13 Aug 2020
একদিন ঝুম বৃষ্টিতে আরও কিছু বাকি থেকে গেল!

[সদ্য প্রয়াত কথাসাহিত্যিক মোস্তফা সোহেলের দুটি উপন্যাসের পাঠ উন্মোচন ও পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান হয়েছিল ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি।

ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধু গবেষক; তৎকালীন দৈনিক খোলা কাগজের সম্পাদক (বর্তমানে দৈনিক বাংলার নির্বাহী সম্পাদক) ড. কাজল রশীদ শাহীন, বিশেষ অতিথি ছিলেন কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (অব.) মাসুদ আহমেদ ও শিশু সাহিত্যিক-গীতিকার সৈয়দ আশেক মাহমুদ ও কথা সাহিত্যিক প্রণব চক্রবর্তী। মোস্তফা সোহেলের উপস্থিতিতে তার দু'টি উপন্যাস ‌'আমি কান পেতে রই'র পাঠ উন্মোচন করেন বাংলাদেশ স্টাডি ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মিল্লাত মাফি ও 'একদিন ঝুম বৃষ্টিতে' উপন্যাসের পাঠ উন্মোচন করেন একই সংগঠনের নির্বাহী সদস্য শাফকাত আলম আঁখি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিপিএইচআরের সাধারণ সম্পাদক নাঈম আহমেদ।  ‘বিপিএইচআর ইয়াং অ্যাপ্রিসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড’ তুলে দেওয়া হয় বিজ্ঞানকর্মী ও লেখক জাহাঙ্গীর সুর, শিশুতোষ ছড়াকার মোহাইমেন মানি, সংগঠক ও অনুবাদক সাবিদীন ইব্রাহিমের হাতে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বাংলানামার নির্বাহী কবীর আলমগীর। 'একদিন ঝুম বৃষ্টিতে' উপন্যাসের পাঠ উন্মোচনে পঠিত প্রবন্ধটি মোস্তফা সোহেলের কথাসাহিত্য সম্পর্কে কৌতুহলী পাঠকের জন্য প্রকাশিত হল। লেখকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। - বি. স.]

কথায় আছে আগে চাই দর্শনধারী; তারপরে গুণ বিচারী! আমার কাছে যে কোনো বই পড়ার আগে তা দেখতেও ভালো লাগা চাই! সেটা আবার কেমন; এই যেমন ধরেন- বইয়ের প্রচ্ছদ এবং ছাপা সুন্দর হতে হবে। কথাসাহিত্যিক কবি ও মানবাধিকারকর্মী মোস্তফা সোহেলের উপন্যাস ‘একদিন ঝুম বৃষ্টিতে’ নামেই একধরনের মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে মনের অজান্তে। আর চোখ জুড়িয়ে যায় ধ্র“ব এষের করা প্রচ্ছদটিতে! বিশ্বাস না হলে এক পলকে দেখে নিতে পারেন আপনারাও! অনেকেই হয়ত বইটি সম্পর্কে জানেন, পড়েছেন, দেখেছেন। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮তে এটি প্রকাশিত হয়েছে। রাত পোহালেই আরেকটি গ্রন্থমেলা শুরু হচ্ছে। এ সময়ে এমন একটি অনুষ্ঠান আয়োজনকে সাধুবাদ জানায়।  একদিন ঝুম বৃষ্টিতে উপন্যাসটি- আমাদের মানব চরিত্রের সহজাত সম্পর্ক, ভালোবাসা, অভিমান আর প্রতারণার যেন সামষ্টিক রূপ। কাহিনী ডালপালা মেলেছে রাহাত ও পালকির দাম্পত্যজীবনকে ঘিরে। বইটি পাঠের শুরুর দিকে সরল-সুখী দম্পতি হিসেবে হাজির হন রাহাত-পালকি। কিন্তু মিথিলার আগমন সব উলট-পালট করে দেয়! রাহাতের সঙ্গে মিথিলার দেখা হওয়াটা একটা টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠে। গল্পের মোড় ঘুরে যায়, জীবন কেমন যেন মোহে আচ্ছন্ন হয়! অস্থির সময়ের ফ্রেম রাহাত-পালকিকে ভিন্ন গতি দেয়! রাহাতের প্রতি মিথিলার অনুরক্তি কিংবা পালকির অন্যপথে হেঁটে চলায় যে আকর্ষণ; তা অনেকটা পুকুর থেকে খালে পড়া মাছের মতো! জেলের জালে আটকা পড়ার আগে খালটাকে হয়ত মাছের কাছে মনে হয়েছিল সমুদ্র! 
উপন্যাস থেকে রাহাতের বয়ানে হুবহু একটা অংশ তুলে ধরছি : ‘‘মিথিলার বাসা ধানমন্ডি সাত নম্বরে। নিñিদ্র নিরাপত্তা এখানে। গলির মাথায় পুলিশের গাড়ি। কেন কে জানে? আমি খুব সতর্কভাবে রিকশা থামাই। পাশেই চায়ের দোকান। দুজন লোক আলস্যে বসে সিগ্রেট টানছে। বৃষ্টিটা কমেছে। পুলিশগুলো নির্বিকার। আমি বেঞ্চে বসি। চায়ের তেষ্টা পাবার ভান করি। তারপর একটা সিগ্রেট জ্বালিয়ে ঝিম মেরে বসে থাকি। একা একা এই ধরনের অপারেশন জীবনে প্রথম! প্রেম- ট্রেম করার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতাও নেই। বিয়ের তিন বছরের মাথায় মোটামুটি ‘নিরাপদ স্বামী’ খেতাব নিয়ে ঘুরছি। আমার বউ পালকি আমাকে পেয়ে বেশ খুশি বলা চলে। আমি অবশ্য গর্বিত। অনেক বয়ফ্রেন্ডের মাঝ থেকে আমাকে পছন্দ করে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলো পালকি। পালকি টেলিভিশনে কয়েকটা প্রোগ্রামে উপস্থাপনা করতো। ‘আহা-আমার পুরুষ জীবন যেন স্বার্থক’-এরকম একটা ভাব দেখিয়ে আমার বাবা হুলুস্থ‚ল কাণ্ড করে ফেললেন। তিনি স্বপ্ন দেখলেন, আর এক মুহূর্ত দেরি না করে আমার বিয়ে দেবার প্রস্তাব করলেন। সাথে সাথে গরু-খাসি জবাই হলো। লোকজনকে দাওয়াত দেয়া হলো। মুহূর্তেই বাড়িটা জনসমুদ্রে পরিণত হলো। পাড়ার দুষ্টু ছেলেরা মাইকের আয়োজন করেছিলো। সেই মাইকে নন-স্টপ গান বেজে চলেছে। ‘নাচ আমার ময়না তুই পয়সা পাবিরে!’ আমাদের বিয়ে হয়ে গেলো। আমার বউ বাসর রাতে ভীষণ একসাইটেড- রাহাত শোনো, তুমি আমার জীবনে এসেছো দেখে আমি না এত্তোগুলা খুশি!’ ভুল বাক্য। তবু মেনে নিলাম। ভাব দেখালাম- আমিও খুব খুশি। সেইভাবে চলছে সংসার। আমাদের কোনো ক্রাইসিস ছিলো না। তবু কেন কি কারণে যে মিথিলাকে আমার ভালো লেগে গেলো- বলা মুস্কিল। পুরুষ মানুষ কি সবসময়ই বহুগামী? আমি অবশ্য পুরুষের এই ধরনের আচরণে কোনো পাপ দেখি না। প্রাচীনকাল থেকেই পুরুষ এসব কাজে নিজেকে বরং অগ্রগামী ভেবেছে। পুরুষের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে আমি শুধু ব্যাপারগুলোকে টেনে নিয়ে যাবো- এই আর কী! সিগ্রেটটায় শেষ টান দেবার সময় পালকি ফোন দিয়ে বসে।’’
এই যে আমরা রাহাতকে পেলাম তার নিজের বর্ণনায়, সেটাও যে পুরোটা নয়, তা কাহিনীর শেষ পর্যন্ত গেলে জানা যায়!
আসলে পাশে থাকা মানুষটির ছোটখাটো ত্র“টি বাস্তব জীবনে আমরা অনেক সময়ই বড় করে দেখি, আর দূরের মরীচিকাকে মনে হয় আলো; সেই আকর্ষণে ভাঙে বিশ্বস্ততা; সম্পর্ক! তবে তা ক্ষণস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী হয়; সময়ই তা বলে দেয়। একঘেয়েমি কাটানোর ছলছুতোয় সাময়িক ভালো থাকা যায়, মনে হয় আহা! এই বিলাস-ব্যাসনই তো জীবন! কিন্তু টেলিফোনের আড়ালে থাকা যে মানুষটির কণ্ঠ শুনতে মন ব্যাকুল হয়; হৃদয় কেঁপে উঠে তার সঙ্গে সার্বক্ষণিক সময় কাটানো, শেয়ারিং যে বোরিং হবে না তারই নিশ্চয়তা কোথায়? তাই কথার যাদুতে; মুগ্ধতায় ভুল পথে পা বাড়ালেই যে জীবন শেষ হয়ে যায়, সেটাও বোধহয় সত্য নয়। এমনই এক সমীকরণ তুলে ধরা হয়েছে ‘একদিন ঝুম বৃষ্টিতে’। মনের গ্লানি ধুয়ে মুছে পূত-পবিত্র হয়ে উঠে অঝরধারায় ঝরে পড়া বৃষ্টিতে; এসময় কাদামাটি-ধুলোবালি ধুয়ে সোদাগন্ধ ছড়ায়! বৃষ্টি মোহন বিকেলের জš§ দেয়; তেমনি রাহাত-পালকির দূরত্ব; অন্যের কাছে ঘেষা ক্ষণিকের ভ্রান্তিবিলাস দূর হতেও সময় লাগে না! মিথিলা ও তার স্বামী হাসান কিংবা রাহাত-পালকির জীবন অভিজ্ঞতা আমাদের সমাজের একটা খণ্ডচিত্র! কথা ও পরিবেশের বর্ণনায় এ চিত্রের উপস্থাপন সত্যি অনবদ্য। উপন্যাসটি পাঠ শেষে মনে হয়েছে- আরও কিছু বাকি থেকে গেল; সেই তৃষ্ণা মনে নিয়েই পরিতৃপ্ত থাকতে হয়! এটাও  মোস্তফা সোহেলের লেখার একটা বড় আকর্ষণ!  

ছবি কৃতজ্ঞতা : আল আমিন লিয়ন