01:42 PM, 08 Jul 2020
মায়াভূতের কবলে

আরিফুন নেছা সুখী

বৃষ্টি পড়ছে টিপটিপ করে। সন্ধ্যা হলেই বই নিয়ে পড়তে বসে প্রতিদিন। বিদ্যুৎ নেই বিকেল থেকে। আবার পড়ালেখার চাপও কম। তাই বসেছে গল্পের আড্ডা। গল্প শুনতে চাইতেই দাদু বললেন আজ আমার জীবনে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা শোন দাদুভা

সে অনেকদিন আগের কথা। আমি তখন স্কুলে পড়ি। আমাদের স্কুল ছিল বাড়ি থেকে বেশ অনেকটা দূরে। তখনতো আর এমন এখানে ওখানে স্কুল ছিলনা। ক্লাসও শুরু হতো খুব সকালে। তাই ভোরের আলো না ফুটতেই বেরিয়ে যেতে হতো। ছিল না কোন গাড়ি ঘোড়া। মাইলের পর মাইল হেঁটে আমরা স্কুলে যেতাম। রাস্তার দু’পাশে ফসলের মাঠ। কোথাও কোথাও দুই একটা বাড়ি।
ওতো সকালে তোমার ঘুম ভাঙতো? বললো সিন্ধু।
পাশে থেকে শিখন বললো এত রাস্তা হেঁটে যেতে! তোমার পা ব্যথা করতো না দাদু?
ওপাশ থেকে সিয়াম বললো এত কথা বলিস নাতো। গল্পের মধ্যে কথা বললে গল্পের মজা থাকে না। তুমি বলোতো দাদু। আর কোন কথা না।
সিন্ধু আর শিখন একে অপরের দিকে তাকিয়ে বললো ‘কোন কথা না’ বড়ভাই বলছে বুঝলা! বলেই দু’জন হি হি করে হাসলো।
সিয়াম কিছু বলার আগেই দাদু ওর দিকে তাকিয়ে হেসে আবার বলতে শুরু করলেন। ঘুম কি আর ভাঙতো! আমার মা ডেকে ডেকে তুলে দিতেন । আর পা ব্যথার কথা বলছো দাদুভাই! সেতো প্রতিদিনের রুটিন তাই সয়ে গেছিল। তো সেদিন হয়েছে কি শোন...
প্রতিদিন মা ঘুম থেকে ডেকে স্কুলে পাঠাতেন বলে খুব রাগ করতেন। আর বলতেন রোজ রোজ এত ডাকতে হয় কেন! একদিনতো নিজে থেকে উঠতে হয় নাকি!
সেদিন ভাবলাম আজ আমি নিজে থেকেই উঠবো। মা ঘুম থেকে উঠার আগে আগেই সব কাজ সেরে নিবো। মা খুব খুশী হবেন।  যেই ভাবা সেই কাজ। মনের মধ্যে একই চিন্তা আজ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে। মা ডাকার আগে উঠতে হবে। ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে ঘুমই আর আসে না। এমন করে করে কখন যে চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এসেছে টেরই পায়নি। মোরগ ডাকার শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো। তখনতো আর ঘড়ি ছিলনা আমাদের। মোরগ ডাকলে বুঝতাম ভোর হয়েছে। তবে মোরগ কখনো কখনো আবার মাঝরাতেও ডাকতো। আমি লাফ দিয়ে উঠে বসলাম। বিছানায় বসে ভাবছি সকাল হয়ে গেল!
আমার নাম ধরে কারা যেন ডাকলো শুনতে পেলাম। বাইরে এসে দেখি আমার দুই বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে আমার জন্য। আমি কোন রকমে তৈরি হলাম। ওরা বারবার তাড়া দিচ্ছে দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে। কোনকিছু খেয়াল না করে হাঁটা শুরু করলাম ওদের পিছুপিছু। কিন্তু আজ ওরা যেন একটু জোরে হাঁটছে। আমাকে পাত্তাই দিচ্ছেনা। কথাও বলছেনা তেমন। মনে হয় তৈরি হতে দেরি হয়েছে বলে এমন করছে। এটা ভেবে আমি আমার মত হেঁটে যাচ্ছি। কিন্তু মনের ভেতর কেমন ভয় ভয় করছে। চারপাশ বেশ অন্ধকার। সকালের আগে আগে সময়টা হলেও কেমন যেন গভীর রাত বলে মনে হচ্ছে। ওদের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে পারছি না আমি। ওরা বেশ এগিয়ে গেছে। মাঝেমাঝে পিছনে তাকিয়ে আমাকে জোরে আসতে তাড়া দিচ্ছে। মনে মনে ভাবছি বাড়ির কথা। সকাল হলো অথচ বাড়ির কেউ ঘুম থেকে উঠলো না। আর কেউ না উঠুক মা সবার আগে ঘুম থেকে ওঠে। কিন্তু মাকেওতো কোথাও দেখলাম না। অবশ্য আমি খেয়ালও করিনি সেভাবে। আমি না হয় ভুল করলাম। কিন্তু ওরা দু’জন আমাকে ডাকতে এলো কেন! ভাবছি বাড়ি ফিরে যাবো। এটা বলার জন্য ওদেরকে ডাকলাম। কিন্তু ওদের দেখা যাচ্ছে না। এমন সময় কুচকুচে কালো দুটো বিড়াল আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। কালো বিড়ালের কথা শুনে দাদুর গা ঘেঁষে বসলো সিন্ধু।
ভয় পাচ্ছো দাদু! বলে আবার শুরু করলেন। দেখি বিড়াল দুটোর চোখগুলো জ¦লজ¦ল করছে। বিড়াল দুটো যেন আমাকে দেখে হাসছে। আমি ভয় পেয়ে চমকে উঠে ওহ মাগো বলে চিৎকার দিলাম। আমার বন্ধুদের দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই ওরা বলে উঠলো কি হলোরে? মনে হলো ওরা আমার পাশেই ছিল। আমি বললাম ওই দেখ্ দুটো কালো বিড়াল।
ওরা হো হো করে হেসে উঠলো। ওদের হাসিটা আমার ভয় আরো বাড়িয়ে দিলো। বললো কই বিড়াল! আর বিড়াল দেখে ভয়ের কি আছে!
ওইতো বলেই দেখাতে গিয়ে আর বিড়াল দুটো দেখতে পেলাম না। আশপাশ চারপাশ কোথাও নেই। এখানেইতো ছিল। কোথায় গেল এক নিমিষে! হঠাৎ মনে হলো সেই কখন থেকে হাঁটছি তবুও সকাল হচ্ছে না কেন! আর স্কুলই বা পাচ্ছি না কেন। এবার যেন মাথাটা ঘুরে গেল। আমার বন্ধুদের দিকে তাকাতেই দেখি ওদের চোখগুলো বিড়ালের মত জ¦লজ¦ল করছে। এবার শিখন দাদুর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো। দাদু বললো ভয় পাচ্ছো তোমরা! তারপর কি হয়েছে শোন। ওরা আমার দিকে বিড়ালের মত থাবা মেলে এগিয়ে আসছে। ওদের সে কি হো হো করে হাসি। আমি প্রাণপণ দৌড়াচ্ছি, দৌড়াচ্ছি... এক সময় পড়ে গেলাম। মনে হলো ওরা আমার গলা টিপে ধরেছে।
তারপর কি হলো বললো সিয়াম।
তারপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরে দেখি আমার ফুপু আমার মাথায় হাত বুলাচ্ছে আর বলছে তুই ঠিক আছিসতো বাবা! কি হয়েছিল আমার বলতেই বললো তুই কোথায় যাচ্ছিলি!
কেন বন্ধুদের সাথে স্কুলে যাচ্ছিলাম।
ফুপু বললো ওতো রাতে স্কুল! ভাগ্যিস তোর ফুপা গঞ্জে যাওয়ার জন্য ভোর ভোর বের  হয়েছিল। না হলে কি বিপদ যে হতো! তুইতো মায়াভূতের মায়ায় পড়ে বাড়ি ছেড়েছিলি। কেন তোর মনে নাই তুই ছোটবেলা মাঝরাতে দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে আসতি! তোর মাতো তোকে একা রাখে না! আজ কি হলো! আর তোকে না কেউ একবার ডাকলেই বাইরে আসতে না করেছিল।
আমি বললাম না ফুপু ভাইজানের পাশ থেকেই চুপ করে উঠে আসছি। কিন্তু আমার বন্ধুরা কই? ওরাইতো আমাকে ডেকে নিয়ে আসলো। আমি এতদূর এলাম কি করে! তোমার বাড়িতো আমার স্কুল পার হয়ে এক গ্রাম পরে।
ফুপু বললো আরে ওরাইতো মায়াভূত। তোর বন্ধুর রূপ ধরে এসেছে। তোকে মায়া করে পথ ভুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। মানুষ দেখে ভয়ে পালিয়েছে। তুই জ্ঞান হারিয়ে বাঁশতলায় পড়েছিলি। তোর ফুপা সেখানেই তোকে পড়ে থাকতে দেখে। তারপর বাড়ি নিয়ে আসে।
মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠলো আমার। মনে পড়লো সেই বিড়াল দুটোর কথা।  ভয়ে ফুপুর গায়ের সাথে গা মিলিয়ে শুইলাম।
ফুপু মাথায় হাত দিয়ে বললো ভয় নেই, ঘুমা একটু।

https://www.rokomari.com/book/200124/mojar-mojar-vuter-golpo