11:45 PM, 05 Jul 2020
আমি কান পেতে রই

সূর্য শিশির

আমরা একেকজন যেন একেকটি হাসান। কারো অর্ধেকটা; কারো পুরোটা কিংবা কারো কিঞ্চিত এই হাসান! আপনারা ভাবতে পারেন এটা আবার কেমন কথা! কিন্তু সত্যিই বলছি- একটু মিলিয়ে নিতে চাইলে একবার চোখ বুলিয়ে দেখুন; কিংবা যারা ইতোমধ্যে পড়

খটকা লাগতে পারে এভাবে বলছি কেন; বলছি কারণ- কথাসাহিত্যিকদের বড় গুণ মানুষকে পাঠ করা; তাকে তুলে ধরা; নিজেকে মেলে ধরা। এরই অনবদ্য-সুন্দর উপস্থাপন যেন মোস্তফা সোহেলের উপন্যাস আমি কান পেতে রই। এই উপন্যাসের নায়ক হাসান; যার সম্পর্কে একটু আগে আপনাদের বলছিলাম!
 দেখুন কী মিল হাসানের সঙ্গে আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের। এই জীবনে আমাদের কত জনের স্বপ্ন-আহ্লাদ ছিল আমেরিকা/কানাডা যাবার। ঘর-সংসার, মা-বাবা, শৈশব-কৈশোর সব কিন্তু এখানে, এই মাটিতে। জšে§র পর এ দেশের মাটিতে প্রথম পা রাখা; প্রথম মাকে ডাকা; প্রথম বন্ধু-বান্ধবীসহ মিলিয়ে দেখুন সব প্রথম এখানে! তারপরও আমরা অধিকাংশই এমন এক শিক্ষাব্যবস্থায় বেড়ে উঠছি, এমন এক মোহের পরিবেশে আকৃষ্ট হচ্ছি- দেশের বাইরে কোথাও যেতে পারা যেন হাতে অমরত্বের সনদ পাওয়া!
ঠিক তাই যেন হাসানের কানাডা যাবার প্রস্তুতি পর্ব দেখে মনে হয়; আমি হলেও তো এমনই করতাম! বৃদ্ধ বাবাকে গ্রামের বাড়িতে কীভাবে রেখে যাওয়া যাবে তার একটা নতুন ফর্মুলা বাতলে দেয় তার স্ত্রী রিমির। কথায় আছে- বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়; এও যেন তেমন- হাসানের চেয়ে কানাডা যাবার আকাঙক্ষা তীব্র হয় রিমির।
হাসান প্ররোচিত হন রিমির কথায়; বাবার জন্য ভালো একটা বৃদ্ধাশ্রম খুঁজতে থাকেন, সরেজমিন চলেও যান এক বৃদ্ধাশ্রমে! সেখানকার ফন্দিফিকির তাকে টানে না! তারপরও তিনি যেন নিরুপায়।
এরই মধ্যে রিমি কানাডা যাবার জন্য আরও দু’পা এগিয়ে যায়! হাসানের বন্ধুর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, ফ্ল্যাটের আসবাবপত্রও বিক্রি করে দেয়! অনিচ্ছা সত্তে¡ও হাসান গ্রামে যায় বাবাকে ঢাকায় এনে বৃদ্ধাশ্রমে রাখার পরিকল্পনা সঙ্গে নিয়ে।
এখানটাই একটা উদ্ধৃতি ব্যবহার করতে চাই; মোস্তফা সোহেলের ভাষাভঙ্গিটাও বোঝা যাবে। হাসানের সঙ্গে তার বন্ধু জামানও গ্রামে এসেছে।
‘... জামান বলল,
কী দেখছি?
আমার শৈশব দেখছি দোস্ত। ছোটবেলায় এইসব রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছি কত। ওই যে বলেশ্বর নদী, ওখানে সাঁতার কেটেছি। মাছ ধরেছি। এখানকার স্কুলে পড়েছে। অনেক স্মৃতি।
কতো বছর পরে এলি ?
অনেক কাল পরে। ঠিক মনে নেই। হাইস্কুল পাশ করে ঢাকায় হোস্টেলে থেকে মানুষ হয়েছি। তার আগে পর্যন্ত এইগ্রাম মানে তালগাছিয়ায় থাকতাম আমরা। একটা অদ্ভুত ভালোলাগার মধ্যে কেটে যেত সারাটা সময়।’
হাসানের এই অদ্ভুত ভালোলাগাটা পাঠক হিসেবে আমাদেরও তার সঙ্গে নেয়। গ্রামে বাবার সঙ্গে কথা বলার পর যখন হাসান মত বদলায়, তখনও পর্যন্ত ভালোলাগাটা আমাদের ছুঁয়ে থাকে! এরপর রিমি হাসানকে না নিয়ে; এমনকি একমাত্র সন্তানকে রেখেই অন্যের হাত ধরে উচ্চাভিলাষ পূরণে কানাডায় পাড়ি জমায়! গ্রামে থেকেই এখবর পায় হাসান! তখন হাসানের সঙ্গে পাঠকও অক‚ল সাগরে পড়ে যায়!
আরও অনেক চমক আছে আমি কান পেতে রই-এ। সেসব এই স্বল্প পরিসরে বলে শেষ করা সম্ভব নয়! আর বই পড়ার যে বিকল্প নেই; আমার চেয়ে আপনারা প্রত্যেকেই বেশি জানেন। তাই বলব- একবার পড়ে দেখুন আমি কান পেতে রই।
এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আলোকপাত করা দরকার। বেশি সময় নেব না; খুবই সংক্ষেপে লেখক মোস্তফা সোহেলের উপস্থাপন ভঙ্গি প্রসঙ্গে একটু বলতে চাই। তার লেখায় বাক্যগুলো ছোট ছোট। অনেকটা শর্টফিল্মের মতো যেন- কাট টু কাট! দৃশ্যান্তরও মিউট! খুব কাছ থেকে জীবনকে উপলব্ধি করেন; আর তারই নির্যাসটুকু যেন ঢেলে দেন কলমে। কথাসাহিত্যিক মোস্তফা সোহেলের সুস্বাস্থ্য ও সুন্দর জীবন কামনা করছি। এমন সুন্দর ও সাবলীল এবং সমসাময়িক সমাজচিত্র নিয়ে তিনি আরও আরও লেখবেন এই প্রত্যাশা।
 

https://www.rokomari.com/book/author/5479/mostafa-sohel