05:06 PM, 28 Jun 2019
মাটির মমতায়


মো. আকরাম হোসেন

সূর্যটা আজ অস্ত যাবে- দীর্ঘ ষাট বছর ধরে এই বাহির চর গ্রামে মনিরের জীবনে উঠছে যে সূর্যটা। তাই শেষবারের মতো দেখে নিতে চায় আজ সূর্যটাকে।

পূবের আকাশ রাঙা করে উঠি উঠি করছে সূর্যটা। দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের মাঝ খানে এসে দাঁড়ায় মনির।
সত্যি ভাবতেও অবাক লাগে, আজ যেখানে সে দাঁড়িয়ে আছে মাত্র বছর দশেক আগেও সেখানে ছিল গহীন গাঙ। অবশ্য তারও বছর বিশেক আগে এটা ছিল প্রায় শত বছরের পুরনো সমৃদ্ধ এক জনপদ। বাংলাদেশের আদুরী সলিলা (বর্তমানে যদিও সলিলা নেই) মেয়ে পদ্মা তখন এখন থেকে প্রায় পঁচিশ মাইল উত্তরে ছিল। নিত্য-নৈমিত্তিক স্বাভাবিক ভাঙ্গা গড়ার মধ্য দিয়েই চলছিল পদ্মার বৈচিত্রময় দিনগুলো। হঠাৎ তার মাথায় চাপল ভাঙ্গনের খেয়াল। অপ্রতিরোধ্য গতিতে ধেয়ে আসতে শুরু করল দক্ষিণ মুখে। পদ্মা পাড়ের মানুষের ভাষায় যাকে বলে রশি ভাঙ্গন- মাত্র বছর পাঁচেকের মধ্যেই বিলীন হয়ে গেল দক্ষিণের বিস্তৃত ভুখন্ড। ভেঙ্গে গেল কত গ্রাম, কত ফসলের ক্ষেত, বাগ-বাগিচা, হাট-বাজার-গঞ্জ, হাসি-কান্নায় ভরা সমৃদ্ধ জনপদ। কোনো এক সিনেমায় গানটা শুনেছিল মনির,
এইতো নদীর খেলারে ভাই এই তো নদীর খেলা
সকাল বেলায় আমীর ছিলি, ফকির সন্ধ্যা বেলা।

নদীর পাড়ের মানুষের থেকে অসত্য আর কে বেশী বোঝে! ঘরগুলো কোনো রকমে ভেঙ্গে আনা গেলেও মনির হারালো তার প্রায় উঠতি ফসল, বাগ-বাগিচা, প্রায় শত বিঘা ফসলী জমি। কিন্তু মাত্র বছর পাঁচেক- বন্ধ হয়ে গেল ভাঙ্গন।
সত্যিই বড় অদ্ভুত রহস্যময় নদীর খেলা। অদ্ভুত অভিন্ন নদী ও নারী। যেমন দ্রুততায় ভেঙ্গেছিল, তেমনি ক্ষিপ্রতায় গড়তে শুরু করল দক্ষিণ পাড়। আবার কেড়ে নিল উত্তর- ফিরিয়ে দিল দক্ষিণ। ফিরিয়ে দিল বটে অত সহজেই কি ফিরে পাওয়া যাবে, প্রায় শত বছরে তিল তিল করে গড়ে উঠা সবুজের সমারোহ, অসংখ্য প্রাণের প্রাচুর্য, শত বছরের সমৃদ্ধি। সবকিছু ওলট-পালট করে দিয, সবটুকু লালিত্য-লাবণ্য কেড়ে নিয়ে ফিরিয়ে দিল রিক্ত শূন্য ধু-ধু বালু প্রান্তর। তবু যে দিল এও ঢের ভাবে মনির। অবশ্য এও ভাবে সে ফিরিয়ে না দিয়ে কি উপায় আছে। রাক্ষুসীর! রাখবে কোথায়? ওর পেটের জায়গা তো আর বাড়ছে না। 
আসলেই তাই। পৃথিবীর আয়তন বাড়ছে না। বাড়বেও না কোনো দিন। আদিকাল থেকে যা আছে তাই থাকবে। পৃথিবীর তিনভাগ জল আর এক ভাগ স্থল। তিনভাগ জলের মাঝে এক ভাগ স্থল টিকে থাকবে, রাজত্ব করবে এ যেন কিছুতেই সহ্য হয় না জলের। এ যেন জলের বিষম লজ্জা। তাইতো প্রতি নিয়ত আক্রোশে ফুঁসে উঠছে, ছোবল মারছে পাড়ের কোলে, বিলীন করে নিতে চাইছে নিজের মধ্যে। কিন্তু পারছে কই!
মনির অবশ্য এতকিছু বোঝে না। তবে এটুকু বোঝে এক দিকে ভেঙ্গে নিলে আর এক দিকে ফিরিয়ে দেয়। ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। সারা জীবন ধরেই তো এই খেলা দেখছে।
নদীর এক‚ল ভাঙ্গে ওক‚ল গড়ে
এইতো নদীর খেলারে ভাই এই তো নদীর খেলা।
তবু ভাঙ্গে কেন?
মনিরের ভাবনায় এ হিসাবও অতি সরল। পদ্মা আসলে যাচাই করে নিতে চায় কে তার আসল প্রেমিক, আসল ভক্ত। যারা নকল প্রেমিক, যাদের ভালবাসা অগভীর, নদীর ভাঙ্গনে নিঃস্ব হতে তারা আবাস বদলায়, বদলায় পেশা। চলে যায় অনেক দূরে- যেখানে নদী ভাঙ্গনের কবলে আর যেন কখনও পড়তে না হয়। কিন্তু যারা প্রকৃত পদ্মা পাড়ের মানুষ, যারা দেখেছে পদ্মার রুদ্র মূর্তির মাঝে কল্যাণময়ী রূপ, যারা দেখেছে দু’তীরের অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য, পদ্মার অফুরন্ত নির্মল বাসাতে শ্বাস টেনে ভরেছে বুক, বিচিত্র স্বাদের মাছের পেটির স্বাদ যারা পেয়েছে, তাদের সঙ্গে আছে পদ্মার নাড়ির যোগ তারা কখনোই পদ্মাকে ছেড়ে দূরে যেতে পারে না। শত কষ্ট বুকে চেপে প্রতীক্ষার প্রহর পার করে নতুন চরের আশায়। এক সময় জেগে উঠে চর। নতুন চরের সঙ্গে নতুন ফসলের রঙিন স্বপ্ন জাগে তাদের ঝিমিয়ে পড়া চোখে। ডাঙ্গা থেকে আবাস সরিয়ে নতুন করে ঘর বাঁধে নতুন চরে। তারা কখনো নদীকে ছেড়ে যায় না। যেতে পারে না।
ছেড়ে যেতে পারেনি মনিরুল। জমি গেল, বাড়ি গেল তাতে তেমন বিচলিত হয়নি। কারণ নদীর পাড়ের মানুষের জীবনে এতো প্রায় স্বাভবিক ঘটনা। কিন্তু বড়ই ভয় পেয়েছিল, হতাশ হয়েছিল মমতা। নিশীত রাতে একান্তে মনিরকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, পোলাগোরে ক্যামনে বাঁচামু গো?
ভাইবো না, আল­াহই বাঁচাইবো শান্তনা দেয় মনির। সম্ভবতঃ তাতে আশ্বস্ত হতে পারেনি মমতা। ভাল মানুষ খেয়ে দেয়ে রাতে ঘুমালো, সকালে আর উঠলো না। সম্ভবত ঘুমের মাঝেই স্ট্রোকের শিকার হয়েছিল।
এবার সত্যিই ভেঙ্গে পড়ে মনির। নাবালক দু’টি বাচ্চা মমিন ও মফিজ। মমিনের বয়স আট মফিজের পাঁচ। এদের নিয়ে কি করবে, কোথায় যাবে মনির? মনিরের মনে পড়ে বাজানের কথা। বাজান বলত, বিপদে ধৈর্য রাখতে হয়। ‘পদ্মা পাড়ে থাকিস, দেহসনা কার মাটি কার গর্ত ভইরা দেয়’।
সত্যিই এ এক মজার ঘটনা। বন্যা নেমে গেলে দেখা গেল সব থেকে উঁচু উর্বর জমিটার চিহ্ন মাত্র নেই। সেখানে সৃষ্টি হয়েছে বিরাট এক গর্তের। বলা যায় ছোট খাট একটা খাল। কয়েক শতাংশ থেকে কয়েক একর পর্যন্ত হতে পারে যার পরিধি। স্থানীয় সাধারণ মানুষের বিশ্বাস এসব শকসের (জলজ দেও দৈত্য বিশেষ) কাণ্ড কারবার। অথচ এমনও দেখা গেছে পরের বন্যার পর খালটা সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে, নতুন বা বালিতে। খালের চিহ্ন মাত্রও অবশিষ্ট নেই।
মনির বিশ্বাস করে- দিনতো চলে যাবে, ব্যবস্থা একটা হবেই। হোলোও তাই। মাস কয়েক পরেই মনিরের দুঃসম্পর্কের নিঃসন্তান এক বোন বিধবা হয়ে আশ্রয় নিল মনিরের ঘরে।
এমন ভাবেই তো কেটে গেল জীবনটা। ছেলেরা বড় হলো, লেখা-পড়া শিখে বড় চাকরিও পেল। জমি হলো, বাড়িও (দশ তলা সু-উচ্চ ভবন) হলো ঢাকার শহরে। কষ্ট করেই অবশ্য মানুষ হয়েছে ওরা। চর যখন জাগল তখন মনিরের জমি-জমা আর নেই বললেই চলে- বাড়ি লাগোয়া মাত্র কযেক বিঘা ছাড়া। মনিরের জমি ভেঙ্গে গিয়ে জেগেছে ঠিকই চরে নয়- ঢাকার শহরে।
ছেলেদের মানুষ করার জন্যই জমি বিক্রি করতে হয়েছিল। জমি ভাঙ্গলে কি হবে! ম্যাপতো ভাঙ্গেনি, ভাঙ্গেনি দাগ খতিয়ানও সরকারের ঘরে জমা আছে সব। জমি নয়- পানি বিক্রি হয়- অবশ্য পানির দরেই। চরের জমির কত রকম কোয়ালিটি- পানি জমি, বালি জমি, খাল জমি, পলি জমি- সবই বেচা কেনা হয়। কোয়ালিটি অনুযায়ী দাম এই আরকি। অবশ্য কোয়ালিটি নিয়ে এমন দুঃচিন্তু নেই কারও। কারণ আজ পানিতো কাল বালি পরশু পলি। খুব দ্রুতই রূপান্তর ঘটে চরের ভ‚মি রূপের।
আর চাষাবাদ। এযেন লটারীতে টাকা পাওয়ার মতই। বন্যা নেমে গেলে পদ্মা যদি সদয় হয়- তার রেখে যাওয়া চাষ বিহীন নতুন পলির উপর শুধু ছড়িয়ে দাও কয়েক মুঠো-বীজ। সার, কীট নাশক, পানি সেচ- কোনোই ঝামেলা নেই। শুধু সময়ের অপেক্ষা। সময় গড়ালে কেটে এনে গোলায় ভরো সরিষা, কলাই, মটর, খেসাড়ী, জাতীয় রবি শস্য। আর এটাই তো পদ্মার কল্যাণময়ী রূপ।

সূর্যটা ততক্ষণে চড়ে গেছে অনেকটাই। আসার সময় বৌমা স্মরণ করিয়ে দিতে ভুল করেনি যেন সময় মতো ফিরে। বেশ কিছুদিন থেকেই ছেলেরা চাচ্ছে না তাদের বাজান এখানে থাক। এখানে তো আর এখন তেমন জমি বা চাষাবাদ নেই। তাহলে কিসের মায়ায় এখানে পড়ে থাকা। এখনও বাজান আছে বলেই ঈদ-পার্বনে না এসে পারে না ছেলেরা। বৌ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে আসা যাওয়ার কষ্ট ছাড়াও সবসময় আধুনিক সুবিধা বিহীন চরের এই জীবনে মাত্র কযেকটা দিন কাটানোও বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে ওদের পক্ষে। বিশেষ করে শহুরে মেয়ে-বৌমা ও শহরে জন্ম নেয়া নাতি নাতনীদের পক্ষে।

নানা ওজর আপত্তি জানিয়ে এতোদিন কোনো রকমে টিকেছিল মনির। কিন্তু কিছুদিন আগে আনেছা অর্থাৎ যে বিধবা বোনটি এদোদিন মনিরের সংসারের হাল ধরেছিল। হঠাৎ করে সে মারা যাওয়ায় ছেলেদের পরিকল্পনা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে। সম্পূর্ণ একা একজন বৃদ্ধ মানুষ। এখানে কে দেখবে তাকে, কে করবে রান্নাবাড়া। বিশেষ করে অসুখ বিসুখ হলে? কাজেই বাবাকে এই অবস্থায় রেখে শত সুখের মাঝেও তারা শান্তি পায় না সমাজও তাদের আচরণকে অমানবিক বলেই ভাবতে বাধ্য। তাই এবারে বাবাকে না নিয়ে কিছুতেই ঢাকা ফিরবে না তারা।

অবশ্য মনিরের ভাবনাটা অন্য রকম। আনেছা নেই বলে কি আর কোনো পথ থাকতে পারে না? কারও জন্য দুনিয়ায় কিছু আটকে থাকে নাকি? তার এখানে থাকাটাকে ছেলেরা ভাবছে বড় কষ্টের। কিন্তু সুখের অন্য পিঠে কি কষ্ট নেই অথবা কষ্টের পিঠে সুখ? কোনো সন্দেহ নেই ঢাকায় উন্নত পরিবেশে, উন্নত ব্যবস্থায় থাকা-খাওয়া চিকিৎসা, সেবা যত্ন সবই ভালো হবে কিন্তু কষ্টটা কোথায় তা কি ছেলেরা বোঝে? সম্পূর্ণ আলাদা, অচেনা একটা পরিবেশ। সেখানে কে চিনে তাকে। কার সঙ্গে বলবে দু’টো মনের কথা। সারাদিন বন্দি হয়ে থাকতে হবে নিজের ঘরে। পাঁচ তলার নিচে নেমে একটু ঘুরে আসার সামর্থ-সাহস-কোনোটাই নেই তার- ঢাকার মতো ব্যস্ত ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা-ঘাটে। চিড়িয়াকানায় বন্দি পশু-পাখিগুলোর থেকে নিজেকে আলাদা কিছু ভাবতে পারেনি, এর আগে একবার যে ক’দিন ছিল ওখানে।

সর্বশেষ যুক্তিটা হচ্ছে, এখানে আর কিছু না থাক, সব আপনজনের কবরগুলো তো আছে এই মাটিতে, এই ভিটায়। বিশেষ করে তার স্নেহময়ী, প্রেমময়ী স্ত্রী মমতা, মধ্য যৌবনে যাকে হারিয়ে তার স্মৃতি বুক আকড়ে ধরেই বেঁচে আছে এতোদিন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একটাই শুধু চাওয়া, তারই পাশে এই মাটিতেই ঘুমাতে চায় চির নিদ্রায়। ছেলেরা কি মানবে? হয়তো হেসেই বলবে, ‘তুমি কি পাগল হইছো বাজান পদ্মার ভাঙ্গনে হেইগুলান কনে নিয়া ফ্যালছে কে জানে’?
মনিরের উত্তরটা কি এতোই ফালতু হবে? কোরআন হাদিস কি মিথ্যা হয়ে যাবে? কোরআন শরীফে স্পষ্ট উলে­খ আছে যাকে যেখানে কবরস্থ করা হবে হাশরের ময়দানে সেখান থেকেই তার উত্থান হবে। তাহলে কবর ভাঙ্গে কি করে? মাটি ভাঙতে পারে, কবর ভেঙ্গে কবরের বাসিন্দাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা নেই পদ্মার।
সূর্যটা অনেকটা উপরে উঠে গেছে। সন্দেহ নেই অনেক দেরী করে ফেলেছে মনির। ছেলেরা হয়তো এতোক্ষণ ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। তা উঠুক। শেষ চেষ্টা একবার করতেই হবে মনিরকে।