06:49 PM, 26 Jun 2019
রেল লাইনে বেওয়ারিশ মানুষটা

কবীর আলমগীর

আমি ছোটবেলায় আমার বাবার খুব ভক্ত ছিলাম। একদম ছোটবেলার কথা আমার তেমন মনে নেই। যতটুকু মনে পড়ে তা নতুন কেনা আয়নার মত

বাবা আমার ক্ষেত-খামারে যেতেন, বাবার কাঁধে উঠে বসে থাকতাম। বাবা আমাকে আইলের কিনারে বসিয়ে রেখে কাজ করতেন। নিড়ানি দিয়ে মাটি খোঁচাতেন, দুই হাত দিয়ে মনের মাধুরি মিশিয়ে আগাছা পরিষ্কার করতেন। এমনকি বাবা মাঠের জঙ্গলে বসে যখন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে বসে থাকতেন আমিও বসে থাকতাম বাবার একটুখানি দূরে।

একটু বড় হয়ে বুঝতে পারি হাটবারের দিন এলেই আমি বাবার জন্য অপেক্ষা করতাম। কখনো বাড়ির গলির সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম। কখনো দৌড়ে চলে যেতাম ইট বিছানো সেই রাস্তাটায়। হাটুরেদের বাইসাইকেলের কোনো রিং বেজে উঠলেই মনে হতো এই বুঝি বাবা এলেন বাড়িতে।
অপেক্ষার প্রহর কাটিয়ে বাবা আমার বাজার থেকে প্রতিদিনের জন্য মিষ্টি আনতেন। সেই মিষ্টি আমাদের মাঝে ভাগ করে দিতেন।
একদিন বাবার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। মা আমাকে সুন্দর জামা-কাপড় পরিয়ে দিলেন। বললেন রাস্তায় গিয়ে যেন খেলাধূলা করি। আমি খেলাধূলা না করে একটা পথ দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম।
অনেক পথ পাড়ি দিয়েছিলাম ওইদিন। পরে জানতে পারি উল্টো পথে এসেছি। বাবা বাজারে যান অন্য পথ দিয়ে। সেদিন গরুর পাল নিয়ে মাঠ ফেরত এক রাখাল আমাকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন। আমি হারিয়ে যাওয়া থেকে বেঁচে গেছিলাম।

শুধু বাবা নয়, আমি মায়েরও ভক্ত ছিলাম। মাকে একপলক দেখতে না পারলে কান্না জুড়ে দিতাম। সেই কান্নার আওয়াজ পাড়াময় ছড়িয়ে পড়ত।
এখন মায়ের আঁচল ছেড়ে থাকি শহরে। বাবার কাঁধ ভুলে গেছি বেমালুম। আমার সংসার হয়েছে। ছোটবেলায় যেমন বাবা-মায়ের অনুগত ছিলাম, তেমনি আমি এখন সংসারেও অনুগত।

কিন্তু একটা ঝড় এসে গেছে কয়দিন হলো।
আমি জানতে পেরেছি বাবা-মায়ের ঔরসজাত আমি নই। আমাকে কুড়িয়ে পাওয়া হয়েছিল। মাকে জিজ্ঞাসা করেছি, মা কোনো জবাব না দিয়ে কেঁদেছেন। আমি বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছি, বাবা কোনো কথা বলতে চাননি।
এই খবরটি জানার পর মনে হলো আমার আর কোথাও দাঁড়ানোর কোনো জায়গা নেই। গ্রাম থেকে অভিমান করে শহরে চলে আসি স্ত্রীর কাছে- আমার মেয়ের কাছে।

আমার স্বার্থপর স্ত্রী খবরটি জানার পর আমার মনে হলো সে কেমন যেন পাল্টে গেছে। রাত-বিরাতে আমার জন্ম-পরিচয় নিয়ে নানা কটূক্তি করতে থাকে। 
আমার ছোট মেয়েটিও আধো আধো বোলে আজকাল জিজ্ঞাসা করছে, ‘আমার বাবা তুমি, তোমার বাবা কে? আমার আম্মু মা, তোমার আম্মু কে?’ মনে হচ্ছে আমার অল্প বয়সী মেয়েটি আজকাল আমাকে চরম আঘাত করতে শিখেছে।
আমার মনে পড়ে রেল লাইনের কথা।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। হাঁটতে থাকি রেল লাইনে। একটা সময় একটা ট্রেন আসতে থাকে। দূরে তার সাইরেনের আওয়াজ বাজে।
আমি শুয়ে পড়ি রেল লাইনে। আমার একটা লম্বা ঘুম দরকার। এক পাশে আমার পা, অন্য পাশে আমার মাথা। রেল লাইনের সি­পারে আমার বুক পেতে রাখা।
রেল আসে। আমার শরীর দিয়ে রেলটা চলে গেল।
আমার বাবার সাইকেলের কথা মনে পড়ছে, বাবার মুখ মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে আমি বাবার কাঁধে উঠে বসে আছি। অসুস্থ মায়ের কথা মনে পড়ছে, মনে হচ্ছে মায়ের আঁচলে।
আমার মনে পড়ছে স্ত্রীর বেজার মুখ, মনে পড়ছে আমার চার বছর বয়সী মেয়েটার কথা।