03:17 PM, 22 Jun 2019
ধূসর অতীত

তামান্না মিমি


নিলয়ের বয়স ৪৫। পেশায় ব্যবসায়ী। ঢাকা শহরে নিজেকে বেশ ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে সে। একমাত্র মেয়ে আনিলা আর স্ত্রী রূপাকে নিয়ে তার পরিবার।

অফিস থেকে বাসায় যাবার জন্যই বের হচ্ছিল নিলয়। এমন সময় রূপার ফোন। রূপা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, ‘নিলয় আমি আনিলাকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।’
: বলছ কী। কী হয়েছে খুলে বল!
-আমি আনিলাকে সাথে নিয়ে শপিং করতে এসেছিলাম। এটা সেটা  দেখছিলাম। হঠাঃ করে ও যে কোথায় চলে গেল আমি খেয়াল করতে পারিনি। পুরো শপিং সেন্টার খুঁজে দেখেছি। কিন্তু ওকে পাচ্ছি না।
: আচ্ছা আমি আসছি। এখুনি আসছি। তুমি কেঁদো না।
-জলদি আসো।

নিলয় গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। ওর পকেটে ফোন বাজছিল। ফোন রিসিভ করল, ‘হ্যালো। কে?’
: আপনি কি আনিলার বাবা বলছেন?
-হ্যাঁ। আপনি?
: আমার নাম নিকুঞ্জ। আনিলা আমার কাছে আছে। ও কাঁদতে কাঁদতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। ওকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, ও ওর আম্মুকে খুঁজে পাচ্ছে না। ওর আম্মুর ফোন নাম্বার মনেও পড়ছে না। কিছু না আগে ওর আপনার নাম্বার মনে পড়েছে। তাই তাড়াতাড়ি ফোন করেছি।
-আপনারা কোথায়?
নিকুঞ্জ ঠিকানা বলে দিল। নিলয় সেখানে পৌঁছে দেখল। ১৮-১৯ বছর বয়সী একটা ছেলের সাথে তার ১০ বছর বয়সী আনিলা দাঁড়ানো। বাবাকে দেখেই আনিলা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো। নিলয় আনিলার কপালে চুমু খেয়ে বলল, ‘ক্লাস ফোরে উঠেছিস। কিন্তু নিজের খেয়াল রাখতে শিখলি না। মা কত কাঁদছে জানিস?
: আমিও খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম। ভাগ্যিস এই ভাইয়া ছিল।
নিলয় এবার নিকুঞ্জের দিকে তাকালো। ভারী মিষ্টি চেহারা। নিলয় বলল, ‘তুমি অনেক ছোট। তাই তুমি করেই সম্বোধন করছি। তোমাকে  ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না বাবা।
: কি যে বলেন আংকেল।আনিলাকে ভালোভাবে ফিরিয়ে দিতে পেরে আমি অনেক খুশি। আপনি ওকে বাসায় নিয়ে যান। আন্টি নিশ্চয় চিন্তা করছে।
-কিন্তু তোমার সাথে ভালোভাবে আলাপ হল না। আমার বাসায় কিংবা অফিসে চলে এসো। আর মোবাইল নাম্বারতো আছেই।
: জ্বি নিশ্চয়।

প্রায় ৩-৪ দিন পর নিলয় নিকুঞ্জকে ফোন দিয়ে বসল। নিকুঞ্জ বলল, ‘হ্যালো আংকেল। কেমন আছেন?’
: এইতো চলছে। তুমি কেমন আছ?
- আমি ভালো।
: আজ কি ফ্রি আছ? তোমাকে নিয়ে লাঞ্চ করতে যাব ভাবছিলাম।
- আমার কোন সমস্যা নেই।
: তাহলে এক ঘণ্টার মধ্যে রেডি হও। আমি তোমাকে নিয়ে বেরোব।

এরপর নিকুঞ্জকে নিয়ে নিলয় একটা রেস্টুরেন্টে বসে বলল, ‘কী খাবে নিকুঞ্জ?’
: আপনি যা খাবেন।
- রোজতো নিজের পছন্দমত খাই। আজ তোমার পছন্দমত খাব।
: আচ্ছা। আমি ফ্রাইড রাইস উইথ বিফ খাব।
- তুমি জানো, আমি অর্ডার দিলে এটাই খেতাম।
: তাই। তাহলেতো মিলেই গেল!
এরপর খাবার এলো। খাবার খেতে খেতে নিলয় বলল, তোমার সম্পর্কে কিছু বলো।
: আমি ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ছি। ফিজিক্সে। ইমিগ্রেশনের জন্য চেষ্টা করছি। হয়ে গেলে দেশের বাইরে চলে যাব। আমার মা-বাবা সিলেটে থাকেন। মা একজন শিকিক্ষা।
-আর বাবা?
: বাবা সরকারি চাকরি করেন, সিলেটেই পোস্টিং। আমার কোনো ভাইবোন নেই। আমি একা। ঢাকাতে হোস্টেলে থেকে পড়ি।
-ও আচ্ছা। আর হ্যাঁ খাবার পর কিন্তু' তুমি আমার সাথে শপিং করতে যাবে।
: কেন আংকেল?
-কেন আবার, আমি বলছি তাই।
এরপর ওরা শপিং করল। নিলয় নিকুঞ্জকে বলল, ‘তুমি যা যা পছন্দ করেছ। এই সব ইয়াং বয়সে আমি খুব পছন্দ করতাম।’
: তাই! আংকেল একটা প্রশ্ন করি? যদি কিছু মনে না করেন?
- অবশ্যই। বল।
: আপনি আমার জন্য এতকিছু কেন করছেন? আপনার মেয়েকে সেদিন খুঁজে দিয়েছি তাই?
- মোটেও সেটা নয়। এটা কিন্তু আমিও ভাবছিলাম জানো? আজ তোমাকে যখন ফোন করে দেখা করতে চাইলাম, তখন থেকেই ভাবছি কেন বললাম। আমি যখন তোমার বয়সে ছিলাম। দেখতে ঠিক তোমার মত হ্যান্ডসাম ছিলাম জানো? আমি আসলে আমার ইয়থটাকে খুব মিস করি যে কারণে আমার মনে হচ্ছিলো তোমার সাথে কিছুটা সময় কাটালে আমি সোনালী অতীতে ফিরে যাব।
: আমি বুঝতে পেরেছি আংকেল আপনার অনুভূতিগুলো। আমার নিজেরই খুব ভালো লাগছে। তবে একটা কথা ভুল বলেছেন আপনি। আপনি এখনো সমান হ্যান্ডসাম।
ওরা হাসতে লাগল।

রাতে বাড়িতে ফিরে নিলয় রূপাকে বলল, ‘আজ সারাদিন নিকুঞ্জের সাথে বেশ সময় কাটলো। মনে হচ্ছিল আমার বয়স কমে ওর মতো হয়ে গেছে।
: নিকুঞ্জ মানে সেই ছেলেটা? আমাদের আনিলাকে যে ফিরিয়ে দিল?
- হ্যাঁ।
: ওকে আবার কোথায় পেলে?
- ফোনে কন্ট্রাক্ট করেছি। এরপর বেশ আড্ডাও দিয়েছি।
রূপা এ নিয়ে আর বেশি কথা বাড়ালো না। ঘুমিয়ে পড়লো।

পরের সপ্তাহে আনিলাকে নিয়ে দাবা খেলছিল নিলয়। এমন সময় ফোনটা বাজল। নিকুঞ্জের ফোন। বেশ সরল স্বরে বলল, আংকেল কি ব্যস্তআছেন? দেখা করতে চাই। মনটা ভালো না।’
: আমি এখনই আসছি বাবা।
নিলয় উঠে দাঁড়ালো। আনিলা বলল, কোথায় যাচ্ছ বাবা? খেলা শেষ না করে আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেব না।
: এমন করে না মামনি।আমার জরুরি কাজ আছে।
- না।না। তুমি যেতে পারবে না।
আনিলার চেঁচামেচিতে রূপা এসে বলল, ‘হয়েছেটা কি?’
আনিলা হাত পা ছুড়ে বলল, মা দেখো বাবা গেম অভার না করেই চলে যাচ্ছে।
রূপা বলল, মেয়ে যখন এত করে বলছে, খেলা শেষ করেই যাও।
নিলয় বলল, আমার তাড়া আছে রূপা। তুমি আনিলাকে বোঝাও। ঐদিকে নিকুঞ্জ অপেক্ষা করছে। 
: নিকুঞ্জ অপেক্ষা করছে তো কি হয়েছে? আর তাছাড়া ওর সাথে এমন কি ভাব তোমার যে নিজের মেয়েকে ফেলে যাচ্ছ ওর কাছে?
- মেয়েকে যে ভালোভাবে ফিরে পেয়েছ তা কিন্তু ওর জন্য।
: উপকার করে কি ও মাথা কিনে নিয়েছে আমাদের?
- তুমি খুব খারাপভাবে কথা বলছ রূপা। কৃতজ্ঞতা থাকা সবার জন্যই ভালো।
বাবা-মার বাকবিতণ্ডা দেখে আনিলা ঘাবড়ে বলল, আমি সরি বাবা। তুমি যাও।
নিলয় আনিলার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলো। এরপর বেরিয়ে পড়লো।

নিকুঞ্জের সাথে দেখা হতেই ও বলল, সরি আংকেল। আমি বোধ হয় বিরক্ত করেছি আপনাকে।
: আরে কি যে বল। আমাকে আংকেল না। নাম ধরে ডাকো। আপনি নয় তুমি সম্বোধন কর।তাহলে আর ফর্মালিটি মনে হবে না।
-কি বলছেন আংকেল নাম ধরে ডাকব?
: হুম। ডাকবে। তুমি সম্বোধন করবে। জানো আমি সব সময় ভাবতাম আমার প্রথম সন্তান যদি ছেলে হয়, আমি ওর খুব ভালো বন্ধু হব। ওকে আমার সব শেয়ার করব। ও নিজের সব কথা বলবে। কিন্ত আমার মেয়ে হল। আমি আশাহত হইনি। বড় লক্ষী মেয়ে আমার। ওর সাথেও বন্ধুর মত মিশি। কিন্তু কোথায় যেন একটা জায়গা ফাঁকা। তাই তোমাকে দেখে সেই জায়গা ভরাট মনে হচ্ছে। তোমার মাঝে আমি আমার নিজেকে দেখতে পাই।
- আমার নিজের মাঝেও একটা ফাঁকা জায়গা আছে। আমার বাবা-মা আমাকে অনেক আদর করে। কিন্তু বন্ধুত্বের জায়গা পাই নি।
: আজ থেকে আমি তোমার বন্ধু।
- আমারো কেন যেন আজ মন খারাপ হতেই তোমার কথা মনে পড়লো। আচ্ছা এবার আসল কথা বলতো নিকুঞ্জ কেন তোমার মন খারাপ?
: আমি বাবা-মার কাছে একটা মোটরসাইকেল কিনে চাচ্ছি। ওরা দিচ্ছে না।
- হঠাৎ বাইকের নেশা ধরলো কেন? গালফ্রেন্ড আছে নাকি? বাইকে নিয়ে ঘুরতে চাও?
: কি যে বলো না নীলাংকু?
-তোকে বললাম নাম ধরে ডাকতে, তুই নীলাংকু ডাকছিস?
: নিলয় ও আংকেল মিলিয়ে নীলাংকু ডাকছি। সরাসরি নাম ধরতে ডাকতে পারব না।
- আচ্ছা এবার বল বান্ধবী আছে?
: বললাম নেইতো। তোমার নিশ্চয় ছিল। তাকে নিয়ে বাইকে ঘুরতে। তাই আমার বেলা তাই ভাবছ।
- কথা একেবারে  মিথ্যে বলিসনি। এই বাইকের কথা তুলে তুই আমার অনেক পুরনো অতীত মনে করিয়ে দিলি।
: তার মানে আন্টির সাথে এক সময় বাইকে খুব ঘুরেছ, তাই না?
- তুই কি আনিলার মার কথা বলছিস?
: হ্যাঁ।
নিলয় ম্লান হেসে বলল, আমি অন্য কারও কথা বলছি। লম্বা কেশ নিয়ে যে আমার বাইকে ঘুরতে খুব ভালবাসত। বাতাসে এলোমেলো হত তার চুল। তুই শুনবি তার গল্প?
নিকুঞ্জ হেসে বলল, ‘ও আচ্ছা। আনিলার মা সেই মেয়ে ছিল না বলে তার গল্প তুমি তার কাছে করতে পার নি? আমাকে বলতে পার। আমি আন্টিকে কিছু বলব না।’
- আমি যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। আমি যাকে ভালোবেসেছিলাম তার নাম দিয়েছিলাম মায়াবতী। আমরা সহপাঠী ছিল। আমার আরেকজন প্রিয় বন্ধু ছিল মন্তু। মন্তুর ভালো নাম কি যেন ছিল মনে পড়ছে না। তবে আমরা সংক্ষেপে ডাকতাম মন্তু। আমরা তিনজন খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। এখন আর কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। ওরা কে কোথায় আছে তাও জানি। আমাদের মাঝে কোনো ঝগড়া হলে মন্তু সবসময় সেটা মিটিয়ে আমাকে আর মায়াবতীকে মিলিয়ে দিত। দারুণ ছিল মায়াবতীর সাথে আমার কাটানো সময়গুলো। সারাদিন টই টই করে আমার বাইকে নিয়ে ঘুরতাম।
: নীলাংকু আমার নিজেরো ইচ্ছে করে আমি কাউকে ভালোবাসি। কিন্তু মাকে কথা দিয়েছি, তাই পারি না। মা এসব প্রেম-টেম বিশ্বাস করে না। বলেছে একেবারে বিয়ে করতে হবে। কোনো মেয়ের বিশ্বাস নিয়ে যদি আবার কথা রাখতে না পারি তাই।
- কেন তোর মার তোর প্রতি বিশ্বাস নেই?
: আমার প্রতি আছে। ছেলে জাতির প্রতি নেই। মা আমাকে খুব কড়াভাবে মানুষ করেছে।
- আরে তুই প্রেম করলে মা জানবে কি করে?
: আমি মার অগোচরে কিছু করি না। যাইহোক তুমি তোমার গল্প বল। বাইকে করে ঘুরতে, খুব ভাব ছিল মায়াবতীর সাথে। তারপর?
- তারপর সেই অঘটন। যে জন্য বাইকের নাম শুনলেই আতংকিত লাগে।
: কি সেই অঘটন?
- আমি মায়াবতীকে নিয়ে এক্সিডেন্ট করলাম। একটা মাইক্রোবাস এসে ধাক্কা দিলো। আমি ছিটকে দূরে পড়লাম। কিন্তু মায়াবতীর পায়ের ওপর দিয়ে মাইক্রোবাস চলে গেল। জ্ঞান ফিরে দেখলাম আমি হাসপাতালে।    মন্তু আমার মাথার কাছে। মন্তুকে জিজ্ঞেস করলাম, মায়াবতী কেমন আছে। ও বলল, মায়াবতীর দুটো পা কেটে ফেলতে হয়েছে।
: ও মাই গড! তারপর?
-এরপর আমি আর ওকে নিয়ে বের হতে পারতাম না। হুইল চেয়ার ছাড়া ও চলতে পারত না। আমি মাঝে মাঝে ওকে গিয়ে দেখে আসতাম। আমাদের বন্ধু মঞ্জু ওর জন্য অনেক করত। হয়ত মঞ্জু ওকে মনে মনে ভালোবাসত। আমার গার্লফ্রেন্ড ছিল বলে কখনো কিছু বলে নি। আসলে মায়াবতী ছিল এমন মায়াময়, যে কেউ ওকে পছন্দ করবে।
: তারপর আলাদা হলে কেন? এত যখন মায়া ছিল, তাহলে কেন দুজনে মিলতে পারলে না?
- বলছি। হঠাৎ একদিন মায়াবতী বলল, ও বিয়ে করতে চায়। আমি বিয়ের কথা বাসায় বললাম। কিন্তু কেউ রাজি হল না।
: কেউ রাজি না থাকলে কি হত? তুমি কোর্ট ম্যারেজ করে নিতে? এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক!
- শেষের দিকে আসলে সম্পর্কটা আগের মত ছিল না। আমি মায়াবতীকে নিয়ে কোনো স্বপ্ন দেখতে পারতাম না। ওকে সকলের সামনে নিতে পারতাম না। খোঁড়া বউ নিয়ে কিভাবে সারাজীবন পার করব এই চিন্তা কুরে কুরে খাচ্ছিলো আমাকে। আমি জানি নিকুঞ্জ এসব শুনে তুমি আমাকে অনেক খারাপ ভাবছ। কিন্তু যা সত্যি আমি তাই বলছি। ঐ মুহূর্তে যে চিন্তাগুলো মাথায় ঘুরছিল আমি তাই বলছি। যদিও আজ সেই কথাগুলো ভাবতে গেলে নিজের প্রতি নিজের ঘৃণা আসে।
: এরপর কি করলে নীলাংকু? মায়াবতীকে সরাসরি বললে যে সে খোঁড়া তাই তাকে তুমি বিয়ে করতে পারবে না?
- হ্যাঁ বললাম। বললাম যে, তুমি আর সেই মানুষ নেই যাকে নিয়ে আমি ঘর বাধার স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমার স্বপ্নের মায়াবতী খোড়া ছিল না কখনো।
: এ কথা শোনার পর মায়াবতী নিশ্চয় তোমাকে চড় মারলো?
- না। আমার মায়াবতী আমাকে কিছু বলেনি। শুধু কেঁদেছে। মঞ্জু ছিল সেখানে, ও রেগে গিয়ে বলল, প্রেম করতে পেরেছিস, বিয়ে করতে পারবি না বললেই হল? তোর বাইকে  চড়েইতো ও পা হারালো। একবার কি দোষ দিয়েছে তোকে। তুই জানিস... মাঝপথে মায়াবতী ওকে থামিয়ে বলল, ‘নিলয়কে ছেড়ে দাও মঞ্জু। ও যখন আর আমাকে যোগ্য ভাবছে না। আমি জোর করে বিয়ে করব না ওকে।’ 
: তারপর?
- তারপর আবার কি। যে যার রাস্তায়। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে বুঝতে পারলাম অনেক বড় ভুল আমি করেছি। ওকে ভুলে যাওয়া সম্ভব না। ওর কাছে ছুটে গেলাম, ওকে আর পেলাম না। মঞ্জুকেও পেলাম না। ওকে হারানোর যন্ত্রণা আর নিজের অনুতাপে নেশাগ্রস্ত হয়ে গেলাম। ২/৩ বছর মায়াবতীকে খুঁজলাম। পেলাম না। অতঃপর আমার জীবন গোছানোর জন্য পরিবার থেকে রূপার সাথে আমার বিয়ে দেয়া হল। আমাদের মেয়ে হল। 
: তাহলেতো  হ্যাপি ইন্ডিং?
- ইন্ডিং, তবে হ্যাপি কি না জানি না।
নিলয়ের দু’চোখ জলে ভরে ওঠে। নিকুঞ্জ বলল, নীলাংকু তুমি কাঁদছো?
নিলয় বলল, নিজেকে মাফ করতে পারি না জানিস? একটা অপরাধবোধ সারাক্ষণ আমাকে তাড়া করে নিয়ে বেড়ায়। কিভাবে আমি ওমন স্বার্থপর হয়ে গেছিলাম ভাবতেই পারি না। আমি আসলে এক হতভাগা। নইলে নিজের ভালোবাসাকে পায়ে ঠেলে দিতাম।
: যা হয়ে গেছে বাদ দাও। অনেকটা সময় পেরিয়ে চলে এসেছ এখন। আমার মনে হয় মায়াবতী যেখানে আছে ভালো আছে। তুমি মন খারাপ কর না। আসো আমরা সেল্ফি তুলি।
এরপর কিছুক্ষণ একসাথে সময় কাটিয়ে নিলয় ফিরে গেল।

এক ছুটির দিনে আনিলা বায়না ধরলো, বাবা আজ কোথাও বেড়াতে নিয়ে চল।
: মার সাথে যাস। আমি বাইক কিনতে যাব।
- তুমি বাইক কিনবে?
: আমি না তোর নিকুঞ্জ ভাইয়ার জন্য কিনব।
পাশেই রূপা বসেছিল। সে রেগে বলল, তুমি তাহলে নিকুঞ্জকে বাইক কিনে দিচ্ছ। কেন? ও কে হয় তোমার?
- ওর মাঝে আমি নিজেকে দেখতে পাই।
: ব্যাপারটা আদিখ্যেতার পর্যায়ে চলে যাচ্ছে কিন্তু। বাড়াবাড়ি শুরু করেছ তুমি। কিছু বলছি না বলে যা খুশি তাই করে যাবে এ হতে পারে না।
- তুমি আবার চুপ করে থাকছ কখন? প্রতিদিন ঝগড়া করে যাচ্ছ।
: আমি আর কিছু বলব না। তোমার যা খুশি তুমি কর।

রূপা রেগে চলে গেলো। নিলয়ের গলা জড়িয়ে আনিলা বলল, তুমি কেমন যেন আমার থেকে আর মার থেকে দূরে সরে যাচ্ছ বাবা। নিকুঞ্জ ভাইয়ার সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে তুমি কেমন যেন ভাগ হয়ে গেছ।
- তুই অন্তত এভাবে বলিস না মামনি। তুই তোর মায়ের মত কথা বলিস না। আমার এই পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস তুই। আমি কি তোর থেকে কখনো দূরে যেতে পারি বল? আচ্ছা চল তোকে নিয়ে ঘুরতে যাব। তোর পছন্দমত বাইক কিনব।
: সত্যি! চল বাবা।
এরপর নিলয় ও আনিলা বাইক নিয়ে নিকুঞ্জর কাছে এলো। নিকুঞ্জ বলল, একি! এত  সুন্দর পালসার বাইক কার?
আনিলা বলল, সারপ্রাইজ! এটা বাবা তোমার জন্য কিনেছে।
- মানে?
নিলয় হেসে বলল, তোর না খুব সখ করেছিল একটা বাইকের? এটা তোর।
: এটা  তুমি কি করেছ নীলাংকু! আমার মা জানলে খুব বকবে আমাকে। কেন এত টাকা খরচ করেছ তুমি?
- তোকে ওতশত ভাবতে হবে না। তুই খুশি হলেই হল।
আনিলা নিকুঞ্জকে বলল, আমাকে একটু বাইকে ওঠাও না ভাইয়া?
এরপর আনিলাকে নিয়ে বাইকে ঘোরাই নিকুঞ্জ।

সব ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ করে একদিন নিকুঞ্জর কোনো খোঁজ নেই। ওর  ফোন বন্ধ। হোস্টেলেও  নেই। ওর সিলেটের বাসার ঠিকানা কেউ ভালভাবে বলতে পারছে না। এভাবে প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেছে। মায়াবতীর মতো নিকুঞ্জও নিখোঁজ। নিলয় মন খারাপ করে বসেছিল নিজের অফিসে। এমন সময় পিয়ন এসে বলল, স্যার একজন মধ্যবয়সী পুরুষ ও মহিলা আপনার সাথে দেখা করতে চায়।
: ওনাদের ভেতরে পাঠিয়ে দাও।
দরজা ঠেলে একজন পুরুষ ঢুকলো। নিলয় কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। লোকটি হেসে বলল, কি আমাকে চিনতে কষ্ট হচ্ছে? আমি মঞ্জিল রহমান। যাকে একসময় আপনি মন্তু বলে ডাকতেন।
নিলয় কাঁপা স্বরে বলল, মঞ্জু তুই? কোথায় ছিলি এতদিন?
 : বেঁচে আছি, ভালো আছি।
- এখনো সেই রাগ যায়নি তোর তাই না।
: আমার সাথে কিন্তু আরেকজন আছেন। আমার স্ত্রী।
- ভাবীকে ভেতরে আসতে বল।
মঞ্জু চেঁচিয়ে বলল, কই এসো? মোহনা এসো।

হুইল চেয়ারে সামনে এল মোহনা। এই মোহনাই নিলয়ের সেই ভালবাসা যাকে নিলয় মায়াবতী নামে ডাকতো। মায়াবতীকে দেখে নিলয় আর স্থির থাকতে পারলো না। হাঁটু গেড়ে বসে তার হাত ধরে বলল, মায়াবতী? এতগুলো বছর কোথায় ছিলে তুমি? আমি পাগলের মত খুঁজেছি তোমাকে।
মোহনা সশব্দে এক থাপ্পড় মারলো নিলয়কে। তারপর বলল, আমি একজনের স্ত্রী। আপনার সাহস কিভাবে হয় আমার হাত ধরার? আর মায়াবতী আমার নাম নয়। আমি মোহনা। আপনার মায়াবতী সেদিন মরে গেছে যেদিন খোঁড়া হবার দায়ে তাকে বিয়ে করতে অস্বীকার জানিয়েছিলেন। তখন এই মঞ্জু এসে দাঁড়িয়েছে আমার পাশে। আমাকে বিয়ে করে স্ত্রীর আসন দিয়েছে। আমাকে আপনি কখনোই ভালবাসেন নি। নীরবে ভালবেসে গেছিলো ও।
: আমি অনেক বড় ভুল করেছিলাম।
- আপনি এখনো ভুল করছেন। কেন লেগেছেন আমার ছেলের পেছনে?
: কে তোমাদের ছেলে?
- নিকুঞ্জ আমাদের একমাত্র ছেলে।
: কি বলছ? আমি সত্যি জানি না এটা।
- আপনি কেন ওকে বাইক কিনে দিয়েছেন? ওকে আমি আমার আদর্শে মানুষ করেছি। আপনার মত নষ্ট চরিত্র আমার ছেলের হতে দেব না। আপনি খবরদার ওর সাথে মেশার বা কথা বলার চেষ্টা করবেন না। আমি চাই না কোনোভাবে ও আপনার মত খারাপ লোকোর সংস্পর্শে আসুক।
: আমাকে এত ঘৃণা কর?
- হ্যাঁ। করি।
মঞ্জু এতক্ষণ চুপ করেছিল। কাগজ কলম নিয়ে কি যেন লিখছিল। নিলয় বলল, কি লিখিস মঞ্জু?
: কিছু না।
- আমি সত্যি জানতাম না নিকুঞ্জ তোদের ছেলে। তাছাড়া আমি নিকুঞ্জকে অনেক ভালবাসি। আমি কি ওর ক্ষতি করতে পারি বল?
: তুই অবশ্য চাইলেও নিকুঞ্জকে আর পাবি না।
- কেন?

: ও এবার সিলেট গিয়ে তোর সাথে ওর সেল্ফি দেখালো। বাইক দিয়েছিস তাও বলল।আমি আর মোহনা তোর ছবি দেখে ভেতরে ভেতরে খুব উত্তেজিত হয়েছিলাম। কিন্তু নিকুঞ্জকে কিছু বলি নি। মোহনা শুধু নিকুঞ্জকে বলল, সে যেন কোনোভাবেই তোর সাথে যোগাযোগ না করে। ওর মোবাইল নিয়ে নেয়া হল। ওকে আর ঢাকায় আসতে দেয়া হল না। ও যেন তোর সাথে যোগাযোগ না করতে পারে সেদিকে কড়া নজর রাখা হল। অত:পর ওর ইমিগ্রেশান হল। আজ ও লন্ডন চলে যাচ্ছে। আমরা ওকে এয়ারপোর্টে রেখে তারপর এখানে এলাম।
- আমার শাস্তি ওকে কেন দিলি? আমার জন্য ওকে কেন দেশছাড়া করলি? মোহনা এবার বলল, সেসব তোমার জানার বিষয় না। তুমি ওর থেকে দূরে থাকো। ব্যাস্। আমরা এখন যাব। চল মঞ্জু।
মঞ্জু বলল, তুমি বের হও; আমি আসছি।

মোহনা বেরিয়ে গেল। মঞ্জু নিলয়ের হাতে একটা কাগজ দিয়ে বলল, এখানে কিছু কথা লিখলাম। যা মুখে বলতে পারছি না। আমরা যাওয়ার পরে পড়িস।
এরপর মঞ্জুুও চলে গেল। নিলয় সজল নয়নে তাকিয়ে রইলো। একটু পরই অচেনা নাম্বারের ফোন এল- ‘হ্যালো নীলাংকু আমি নিকুঞ্জ। আমি আজ লন্ডন যাচ্ছি। ফ্লাইট এক ঘণ্টা লেটে ছাড়বে। তুমি কি আসবে আমাকে দেখতে? খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তোমাকে। বাবা-মা কেন যে তোমার সাথে যোগাযোগ করতে দিল না বুঝলাম না। প্লিজ নীলাংকু এসো না?
: আমি আসছি বাবা।

এয়ারপোর্টে এসে নিলয় নিকুঞ্জকে জড়িয়ে ধরে বলল, চলে যাচ্ছিস বাবা?
- হ্যাঁ। আমাকে বলো, তুমি আমার বাবা-মাকে কি চেনো?
: কি যে বলিস বোকার মত? আমি কিভাবে চিনব?
নিকুঞ্জ বাবা-মার ছবি বের করে দেখিয়ে বলল, দেখ? চেন এদের?
- না। আমি চিনি না। দেখিও নি কখনো।
: তাহলে ওরা কেন এমন করলো?
- সন্তানের ভালোর জন্য মা-বাবা অনেক কিছু করে। সব উত্তর খুঁজতে যাস না।
: আমি খুব মিস করব তোমাকে।
- ভালো করে পড়িস বাবা।

: ফ্লাইটের সময় হয়ে এলো, আমি আসি?
- যা।
নিকুঞ্জের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ও দ্রুত চলে যায়। নিলয় নিজের চোখের জল মোছার জন্য রুমাল বের করতে গিয়ে পকেটে হাত দিয়ে মঞ্জুর চিঠিটা পেল। সেখানে লেখা-

নিলয়,
তুই অনেক ভুল করেছিস জানি। কিন্তু আজ যদি তোকে একটা সত্যি না জানাতে পারি, তবে সারাজীবন নিজেকে অপরাধী মনে হবে। তোর মনে আছে, মোহনা হঠাৎ করেই তোকে বিয়ের জন্য প্রেসার দিয়েছিল? কারণ ও তখন সন্তান-সম্ভবা। তোর সন্তানের মা হতে যাচ্ছিলো সে। তোদের ভালবাসার গভীরতা এত বেশি ছিল যে, তোরা কখনো ভাবিসনি আলাদা হয়ে যেতে পারিস। যদিও এতখানি অগ্রসর হওয়া তোদের দু’জনেরই ভুল ছিল। অত:পর তুই যখন মোহনাকে বিয়ে করতে অস্বীকার করলি সে আর তোকে কিছু জানায় নি। আমি জানাতে চাইলে সে বলেছিল, যে আমাকেই স্বীকার করছে না, সে সন্তানকে কিভাবে স্বীকার করবে? তুই হয়ত এও বলবি যে সন্তান তোর না। এই ভয়ে মোহনা তোকে কিছুই বলেনি। এরপর আমি সেই সন্তানকে স্বীকৃতি দিয়ে মোহনাকে বিয়ে করি। আমিও মোহনাকে ভালবাসতাম তবে তা নিঃশব্দে। কারণ মোহনা তোকে ভালবাসত। যাইহোক, অবশেষ আমি ওকে পেয়েছি। সন্তানসহ পেয়েছি। আমি খুব খুশি। তাইতো ওকে নিয়ে সকলের আড়ালে অনেক দূরে গিয়ে সংসার পেতেছি।

আর হ্যাঁ, নিকুঞ্জ তোরই ছেলে। তোর সাথে ওর পরিচয় দেখে মোহনা ভয়ে ওকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আমি মোহনাকে কথা দিয়েছিলাম, তোকে কথাটা কখনো জানাবো না। কিন্তু বন্ধুত্ব বলেও একটা শব্দ আছে। তাই তোকে অন্ধকারে রাখতে পারলাম না। ভাল থাকিস।
মঞ্জু

লেখাটা পড়ে নিলয়ের শরীরর ঠাণ্ডা হয়ে এলো। বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হল। আর একটু যদি বুকে জড়িয়ে রাখা যেত ছেলেটাকে। যদি একটু আগে পড়তো ও চিঠিটা। এই বুঝি রক্তের টান। কষ্ট একটাই- আনিলার মত ওকে আর সন্তানের স্বীকৃতি দিতে পারছে  না ও। এটাই বুঝি পাপের শাস্তি।