05:56 PM, 18 Jun 2019
উড়ে যাওয়ার মুহূর্তে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল

 উপল তালুকদার

সে দাঁড়িয়েছিল ঠাটা-পড়া তালগাছের মতো। হয়তো একটু ভয় হয় তার অথবা সে কান্না শোনে শিশুপুত্রটির, অথবা গলির মোড়ের নুলো কুকুরটিই হয়তো কঁকিয়ে উঠেছিল।

নিজের সামনে সে তার তেপ্পান্ন বছর বয়সী অবিকল প্রতিমূর্তি দেখে, যে তাকে বারবার তাগিদ দিয়ে ফিসফিস করে বলে : ‘দেরি করছিস কেন? সময় নেই, একদম সময় নেই।’ পরিষ্কারভাবে নিজের সামনে আর একজন নিজেকে সে দেখতে পাচ্ছে, যদিও পোশাক-আশাকে আর গলার স্বরে কোনো মিলই নেই তাদের ভেতর। সে কি তাহলে মাদাম তুসোর মিউজিয়ামে নিজের মোমের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছে? গাঁজা সে খায়নি, কশে টেনেছে গোল্ডলিফ পরপর চারটে। গাঁজার চার চারটা স্টিক টানার পরেও সে থাকে দিব্যি টনটনে, সিগারেটের কী সাধ্য তার ভেতরে বিভ্রম সৃষ্টি করে; সে হলোই না গোল্ডলিফ। তবু নিজেকে সে একটু ছুঁয়ে দেখতে চায়। কৌতূহল মিটিয়ে নেওয়াই ভালো নিজেকে সে বোঝায় আর তার সামনাসামনি দাঁড়িয়ে থাকা অন্য তার ঘাড়ের পেছনটায় আলতো করে হাত রাখে। 


আমগাছের দোলনায় সে আস্তে আস্তে দোল খাচ্ছে। সে কীভাবে ফিরে গেছে তার কৈশোরে?  তা-ই তো! সে ফিরে গেছে তার আটবছর বয়সে। অবশ্য সে বুঝতে পারে না, নওয়া চাচাদের জাম্বুরা গাছে সে দোল খাচ্ছে কেন এই মাঝরাতে? সহসা সে উত্তর খুঁজে পায় না। উত্তরটি সে খোঁজার চেষ্টা করে কিন্তু এই মুহূর্তে তাকে নতুন আরও একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে; প্রশ্নটি হলো : তার নিঃশ্বাস ক্রমশ বন্ধ হয়ে আসছে কেন? তাহলে কি তাকে বোবায় ধরেছে? দাদিজান তো ঘুমানোর আগে প্রতিদিনই বলে, ‘দুই পাও মিশাইয়া টানটান হইয়া শুইবা না ভাই, বোবায় ধরবে!’ পাও টানটান কইরা ঘুমাইলে বোবায় ধরে ক্যান বুজি? ‘মানুষ মইরা গেলে তারে গোছল দিয়া কাফনের কাপুড় পরাইয়া টানটান কইরা যখন শুয়ায়, তখন নাক বরাবর দুই পাও টানটান থাকে, দ্যাহো নাই ভাই? জ্যাতা মানুষ যদি ঘুমানির সুমায় দুই পাও অমুন নাক বরাবর টানটান করে, তাইলে  মউত একটা কালা বিলাইয়ের ছুল ধইরা হেরে জাইত্তা ধরে। এইডাই বুবায় ধরা কয়। এই সুমায় হেরে কেউ ঠেলা না দিলে নয়তো হে কাউরে চাইপা না ধরলে বিপদ রে ভাই, মহাবিপদ। থাকগ্যা এইসব, তুমি ঘুমাও। রাইতের কালে এইসব কথা কওয়া ভালা না। আমারে জড়াইয়া ধইরা ঘুমাও। আরে লজ্জা পাও ক্যা?  আমি না তুমার বড় বুইন?’ 

সে তার বুজিকে অবশ্য দেখতে পাচ্ছে না। রাতের বেলা কি কাউকে দেখা যায় নাকি? টিউবলাইটের উজ্জ্বল আলো শাদা শাদা শিমুল তুলার মতো বুদবুদ ফোটাচ্ছে, নিচে ফেনিল অন্ধকার ক্রমশ গুলিয়ে মিশে যাচ্ছে ঘরময়; তবু সে দেখতে পায়: আরএফএল এর পাতলা চেয়ারটি তার পায়ের নিচ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে ক্রমশ স্টিলের আলমারির দিকে সরে যাচ্ছে। মট করে কিছু একটা ভাঙার শব্দ হয়তো সে শোনে। হয়তো সে রাতের বেলা উহাব কাকাদের আখক্ষেতে গেছে দশাসই চিনিচাম্পা আখ চুরি করবার মতলবে। চিনিচাম্পা আখের ডগার দিকে থাকে অদৃশ্যপ্রায় অজস্র হুল, যা হাতে লাগলেই বিষম জ্বলুনি। হুলের ভয়ে নিশ্চয়ই মাঝপথে সিদ্ধান্ত বদলে সে নিজেদের আখক্ষেতেই গেছে। তাদের তো আর চিনিচাম্পা আখক্ষেত নাই, তাদের তো কেবল মিলছাট আখের ক্ষেত। চিনিচাম্পা আখ ভাঙলে তো আর এত শব্দ হওয়ার কথা নয় যতটা শব্দ সে শুনতে পেয়েছে।  মিলছাট আখ ভাঙলে বেশ একটা শব্দ হয়। সে প্রায় নিশ্চিত হয়, রাতের বেলা সে নিজেদের মিলছাট আখক্ষেতেই আখ আনতে গেছে। তার মুখ বেয়ে আখের রসও দেখি গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। আখের রস হয় ঘোলা পানির মতো, কিন্তু তার মুখ থেকে ফেনাযুক্ত যে আখের রস চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে তার রঙ লাল। ডায়াবেটিস এ তেপ্পান্ন বছর বয়সেই তার অর্ধেক দাঁত পড়ে গেছে। যে গুলো অবশিষ্ট আছে, সে গুলোর কোণায় কানায় গাতা-গর্ত। তাই ব্রাশ করার সময় তার টুথপেস্টের ফেনা শাদা-লাল ডোরাকাটা ডোরাকাটা হয়- ভাবে আর সে একচোট হেসে নেয়। নিজেদের ক্ষেতের আখ চুরি করতে সে কিনা রাতবিরেতে নদীর পাড়ে গেছে, এই ভাবনাটাও তাকে হাসায় এবং কিঞ্চিৎ দুঃশ্চিন্তা করে। রাস্তার উলটা দিকেই তো গোরস্থান। তার বয়স পাক্কা তেরো, নয়?  সে কি বাচ্চা ছেলে নাকি যে ভয় পাবে?  নিজেকে সে বলে।


ঘরের আলো ক্রমশ কমে আসছে যেন। অথবা তার হয়তো মনে হয়, কালো মেঘে আকাশ ঘনিয়ে আসছে এই অতিক্রান্ত দুপুরবেলাতেই। অথবা তার হয়তো মনে পড়ে ঝড় এসেছিল একটু আগে,  আর সেই উছিলায় পল­ী বিদ্যুৎ কারেন্ট অফ করে দিয়েছে। ঝড় থামেনি বরং বাতাসের বেগ আরও বেড়েছে সম্ভবত। নইলে নীল পর্দাগুলো এত উড়ছে কেন? নীল পর্দা, নাকি তার নীলরঙা চেক লুঙ্গি? তার কোমর থেকে কি নীল রঙের চেক লুঙ্গিটাই খসে পড়েছে নাকি? তাই তো মনে হচ্ছে। নীল লুঙ্গিটা মোলায়েমভাবে পড়ে আছে মেঝের ওপর, যেন নীলকণ্ঠ কোনো পাখি ডানা বিছিয়ে শুয়ে আছে ঘুমাবে বলে। কত সহস্র দিবস সহস্র রজনী অর্থহীন ওড়াউড়ি করে সে যেন খুব ক্লান্ত। ভুলই হয়েছে, চরম ভুল হয়েছে  সে ভাবে। লুঙ্গি পরে তার আকাশে ওড়াটা চরম বোকামি হয়েছে। থ্রি কোয়ার্টারগুলোর একটা পরে নেওয়া উচিত ছিলো, নিজেকে সে ধিক্কার দেয় আর বলে, অন্তত লুঙ্গিটা টাইট করে গিটঠু দিয়ে পরলেও তো বেইজ্জতি হওয়ার আশঙ্কা ছিলো না। আলোকিত অন্ধকারে লজ্জা তাকে কোনোদিন পিছু ছাড়েনি বলেই কি অন্ধকারের উৎসমুখে উদ্ভাসিত আলোকসজ্জাতেও লজ্জাই তার সঙ্গী হবে? একপাশে ঈষৎ কাত হয়ে থাকা তার শান্ত, সৌম্য মুখটি যেন একটু বিষন্ন দেখায়।