03:34 PM, 13 Jun 2019
বালাই ষাট আবু হাসান শাহরিয়ার ও ‘নোনা ব্যঞ্জনার শিলালিপি’

দেশের একজন প্রতিথযশা আধুনিক কবি ও সাহিত্যিক আবু হাসান শাহরিয়ার। তিনি সাংবাদিক হিসেবেও বেশ সুপরিচিত।

বিশেষত তিনি দৈনিক মুক্তকণ্ঠ পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক থাকার সময় আট পৃষ্ঠার বহুবর্ণিল সাময়িকী খোলা জানালা বের করে শিল্প-সাহিত্যমোদীদের বাড়তি নজর কাড়েন। তার সম্পাদনায় দুই বাংলার শক্তিমান লেখক-কবি-সাহিত্যিকদের পাশাপাশি তরুণরা দু'হাতে লিখতেন খোলা জানালায়। খোলা জানালা দুই বাংলায় বেশ জনপ্রিয়তা পায়। ‘খোলা জানালা’য় ওপার বাংলার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, অর্ধেন্দু চক্রবর্তী, মঞ্জুষ দাশগুপ্ত, কিন্নর রায়ের কবিতা ও প্রবন্ধ যেমন মিলেছে তেমনি এপার বাংলার শামসুর রাহমান, সিকদার আমিনুল হক, আবু হাসান শাহরিয়ার, আওলাদ হোসেন, নুরুন্নাহার শিরীন, টোকন ঠাকুরদের দীর্ঘ কবিতা ও প্রবন্ধ-নিবন্ধের দেখা মিলেছে।

খোলা জানালা অনেক ব্যতিক্রমী ও প্রথম আয়োজন করে চমকে দিয়েছে আমাদের সদ্য সাহিত্যালোকিত মনটাকে, তখন আমরা ১৯৯৮ সালে ২১-২২ পেরুনো তরুণরা; শিল্প-সাহিত্যের পথটা নানাভাবে চিনছি, লিখছি না যতটা; পড়ছি আরও আরও বেশি! পাঠকদের চিঠি নিয়ে খোলা জানালার আগে কোনো সাময়িকীর আয়োজন চোখে পড়েনি; খোলা জানালায় পাঠকদের চিঠি নিয়ে থাকত ‘খোলামত’ বিভাগ; সেই বিভাগটাকে প্রচ্ছদে নিয়ে আসার অভিনবত্ব যেন আবু হাসান শাহরিয়ারকেই মানায়! পাঠকদের চিঠি নিয়ে ‘একপশলা খোলামত’ নামে প্রচ্ছদ-আয়োজন (সংখ্যা ৩৭, ৩ জুলাই ১৯৯৮) করে আরেকবার মুগ্ধতায় আটকে দেয় খোলা জানালা।

''অকালপ্রয়াত কবি নাসিমা সুলতানাকে (১৯৫৭-১৯৯৭) নিয়ে একটি সংবেদনশীল সংখ্যা প্রকাশ করেছিল ‘খোলা জানালা’; এছাড়া শওকত ওসমান, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ও কায়েস আহমেদকে নিয়ে পরিকল্পিত সংখ্যা ‘এক ভুবনের তিন বাসিন্দা’, নাসির আলী মামুনের সচিত্র প্রচ্ছদরচনা ‘বিট সাম্রাজ্য’, ময়ুখ চৌধুরীর সুদীর্ঘ সরস প্রবন্ধ ‘কবিতা ও তার পাড়াপ্রতিবেশী’―এরকম আরও কিছু লেখা ‘খোলা জানালা’র স্মরণীয় উপহার। '' [মুয়িন পারভেজ, ১৮ আগস্ট ২০১৫, মুক্তাঙ্গন ডট ব্লগ]।


‘চাঁদের বদলে আজ উঠেছেন চারু মজুমদার’ : নকশাল আন্দোলন ও তেভাগা আন্দোলনের পুরোধব্যক্তিত্ব চারু মজুমদারের জন্মশত পেরিয়েছে সদ্যই ( ১৪ মে)। আর ২০০০ সালের ৬ জুলাই দৈনিক আজকের কাগজ-এর সাময়িকীতে প্রকাশিত হয় আবু হাসান শাহরিয়ারের ‘চাঁদের বদলে আজ উঠেছেন চারু মজুমদার’ প্রবন্ধ। বাম এ রাজনীতিককে নিয়ে সেখানে কী লেখা ছিল আর কী ছিল না, তার চেয়ে বড় হয়ে উঠে চারু মজুমদারকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধের কাব্যিক এ শিরোনাম, মনে গেথে যায়; আজও অমলিন এর গগণচুম্বী ছোঁয়া! কবির লেখায়- হোক সে প্রবন্ধ; সেখানে কাব্যের ঘাটতি অন্তত আবু হাসান শাহরিয়ারে মেলা সোনার পাথরবাটি!

আবু হাসান শাহরিয়ার দৈনিক যুগান্তরেরও সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার সম্পাদক থাকাকালীন শিরোনাম ও সম্পাদনায় আনেন ব্যতিক্রমী পরিবর্তন। তিনি একজন আপাদমস্তক কবি, পাশাপাশি সাংবাদিকতায় শানিত; তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণী শক্তির কারণে অনায়াসে কবিতার লাইনকে তুলে আনতেন শিরোনামে! বিস্ময়-মুগ্ধতায় আমরা সকালে চায়ের টেবিলে পত্রিকা পড়তাম কবিতার স্বাদে!

শিরোনাম ব্যবচ্ছেদ : এ লেখা যখন লিখছি, তখন দেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২.৩ বছর (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য, ১২ জুন ২০১৯)। তারপরও অমঙ্গলকে দূরে ঠেলতে আবু হাসান শাহরিয়ারের ৬০ বছর পূর্তির প্রাক্কালে (জন্ম ২৫ জুন) সেই গ্রামীণ চিরচেনা শব্দ বালাই ষাট সচেতনভাবেই লেখছি; প্রত্যাশা এ ষাট সাড়ম্বরে অতিক্রম করে কবি শতবছর পেরিয়ে যান। তবে এ দেশে কবি আর সাংবাদিকের আয়ুর নিম্নগতি আমাদের অনেক সময়ই ভারাক্রান্ত করে! এমনটি আমরা চাই না।

কবি যেন তবুও সাংবাদিক : আবু হাসান শাহরিয়ার এখন সাংবাদিকতার সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে নেই; তবুও যেন কবিতার বাইরে যা লেখেন; তার অনেকখানিই সাংবাদিকতায় হৃষ্টপুষ্ট ও দুষ্ট! এই তো ক'দিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক) এক স্ট্যাটাস দিলেন; সেটায় একটু নজর দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। সুন্দর সমীপে শিরোনামে তিনি লেখেন- ''আমপাঠক সমকালের ভালোমন্দ যাচাইয়ে সবকালেই বিভ্রান্ত হয়েছেন। তবে, একালে তাদের সংখ্যা তুলনামুলকভাবে অনেক বেশি। নিবিড়পাঠে পাঁচ-সাতখানা কালজয়ী বই থাকলে এ বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত থাকা যায়। কালজয়ী বই ওজননির্ধারক বাটখারা। সুসম্পাদিত সাহিত্যপত্রের সান্নিধ্যে থাকলেও সমকালের মহার্ঘকে চেনা যায়। গুণবিচারী গ্রন্থসমালোচনাও পাঠককে সহযোগিতা করে। একালে সর্বত্র বৈদগ্ধ্যের সংকট। সংবাদপত্রগুলো খবর বিক্রির পাশাপাশি ইদসংখ্যা ও পুজোসংখ্যার নামে সাহিত্যও বাজারজাত করছে। সাহিত্যচর্চা নয়, মুখ্য উদ্দেশ্য বিজ্ঞাপনী আয়। দু-একটি ভালো লেখা যে সেখানে প্রকাশিত হয় না, তা বলছি না। তবে, অধিকাংশই ভুসিমাল। নবীন লেখকদের সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র হিসেবে সাধুবাদ পেলেও সুসম্পাদনার অভাবে খুব কম ছোটকাগজই প্রতিপত্রিকার দার্ঢ্য দেখাতে পারছে। অমর একুশে বইমেলাকে ঘিরে বইপ্রকাশের হিড়িক পড়ে। ৯০ শতাংশ বইই পাঠযোগ্য নয়। ভাষাদূষণ প্রতিরোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলে ওইসব বইয়ের লেখকদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো। ওদের পক্ষে কেউ কেউ এই খোঁড়াযুক্তি দেখান যে, খুন-ধর্ষণ না করে ওরা লেখালিখি করছে; উৎসাহ দেওয়া উচিত। চার আনা সত্য আছে একথায়; বারো আনাই অসার। ঠিক, ভুল করতেই করতেই শেখে মানুষ। তাই বলে উপর্যুপরি ভুলে পুনঃপুন বইপ্রকাশ? প্রশ্ন এই যে, কোন বয়স পর্যন্ত উৎসাহ দেওয়া উচিত? পাল্টা যুক্তি— ভুলেভরা বই ভাষাকে খুন করে; এপ্রকার বই ভাষাধর্ষক।

সরস্বতী বিতাড়িত; বাঙালির আড্ডায় এখন শুধু লক্ষ্মীর বসতি। ফলত ভাবনাবিনিময় নেই; সুস্থ তর্কও দূর নির্বাসনে। সুস্থ তর্ক চিন্তার খোরাক জোগায়। তাতে যুক্তিপূর্ণ পূর্বমীমাংসা, মধ্যখণ্ডন ও উত্তরমীমাংসা থাকে। এমন তর্কই মানুষের চিন্তারাজ্যে বিস্তার এনেছে। যে-সমাজে তা নেই, সেই সমাজে মন্তব্যসর্বস্ব কুতর্কের বাম্পার ফলন হয়। কুতার্কিকরা যুক্তির ধার ধারে না। যুক্তি-প্রমাণ ছাড়া কোনও বিষয়ে মন্তব্য করাকে কথা নয়, কুকথা বলে। যথাযথ প্রমাণ ছাড়া কোনও ব্যক্তি সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করলে তাকে কুৎসা বলে। কথা এই যে, প্রশংসাকৃপণ বাঙালি ভালোকে 'ভালো' না বললেও কুৎসারটনায় পারদর্শী। এটা জেনেই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন— 'মূঢ়দের সঙ্গে কথা বলতে গেলে নিজেকেও মূঢ় হতে হয়।' এর অর্থ এই দাঁড়ায়, মূঢ়দের সঙ্গে বেশিক্ষণ কথা না-বলাই বিচক্ষণতা। মৌর্য্যসম্রাট চন্দ্রগুপ্তের পরামর্শক চাণক্যের শ্লোকে পাই— 'মূর্খেষু মূর্খবৎ কথায়েৎ' (মূর্খের সঙ্গে মূর্খের মতো কথা বলো)। সম্ভবত এ কারণেই নিৎসে বাজারি জনতাকে সত্য জানিয়ে সেখান থেকে দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হতে বলেছেন। তিনি জানতেন, চিন্তায় বামনরা উচ্চতাকে সহ্য করে না। নিৎসের 'Thus spoke Zarathustra' বই আমাদের এ বার্তাই দেয়।। অকারণ স্তুতিও গ্রহণযোগ্য নয়। স্রেফ চাটুকারিতা।

কারণ না দর্শিয়ে ভালো-মন্দ কোনওটাই বলার সুযোগ নেই সমালোচনা সাহিত্যে। নিছক মন্তব্যে কাউকে বা কারও কৃত্যকে 'overvalued' কী 'undervalued' করা হলে সাহিত্যের পরিভাষায় তাকে 'misreading' বলে। এই নামে ইতালির লেখক উমবার্তো ইকোর একটি বই আছে। মন্তব্যসর্বস্ব যে-কোনও মূল্যায়নই 'মিসরিডিং'। যারা তা করে, রবীন্দ্রনাথ তাদের 'পণ্ডপণ্ডিত' এবং জীবনানন্দ দাশ 'অশিক্ষিতপটু' বলেছেন। এরা বদ্ধচিন্তক— 'close ended' মনোরাজ্যের বাসিন্দা— জানে কম, বোঝে বেশি— কূপমণ্ডুকতাকে অযৌক্তিকভাবে আঁকড়ে থাকে। মুক্তচিন্তকরা ভাবনাবিনিময়ে 'open ended'— যুক্তিতে পরাস্ত হলে ভিন্নমতকে সাদরে গ্রহণ করেন। কবিরা আগাম আসেন পৃথিবীতে। তাই, জীবনানন্দ দাশ আগাম বুঝেছিলেন— 'অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ;/ যারা অন্ধ, সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা।' তাই, হুমায়ুন আজাদ বলে গেছেন, 'সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।' সব কিছু নষ্টদের অধিকার যাওয়ার বাকি আছে কি কিছু? যা কিছু সুন্দর, নষ্টচোখে অসুন্দর দেখায়। একথা কবিতায়ও বলেছি— 'নষ্টচোখে পাখিকেও আকাশের ময়লা মনে হয়।' এ প্রসঙ্গে আমার নতুন কিছু বলার নেই।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে লেখা রবীন্দ্রনাথের এক চিঠিতে পাই— 'যেটা প্রশংসার যোগ্য, তাকে প্রশংসা করলে নিন্দা করবার অনিন্দনীয় অধিকার পাওয়া যায়।' অর্থাৎ, প্রশংসাকৃপণ ব্যক্তির মুখে নিন্দা মানায় না। কারও বা কোনও কিছু সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলা তার-ই সাজে, যিনি ভালোকেও ভালো বলতে জানেন। দুরকমভাবে হতে পারে এটা— ১. যার সম্পর্কে বা যে-বিষয়ে নেতিবাচক কথা বলা হচ্ছে, তার যদি ভালো কিছু থাকে, তা-ও বলা, ২. প্রতিপাদ্য ব্যক্তির বা বিষয়ে গুণবাচক কিছু পাওয়া না গেলে যার বা যেখানে তা আছে, তার প্রশংসা করা। দোষেগুণে মানুষ। কারও মধ্যে গুণের সমাহার বেশি হলে তার একটি-দুটি দোষের কথা উল্লেখ না করলে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না; কিন্তু, সিংহভাগ গুণকে উহ্য রেখে ওই একটি-দুটি দোষ নিয়ে পরচর্চামুখর হওয়াই বাঙালির স্বভাববৈশিষ্ট্য। দোষের সত্যতাও প্রশ্নসাপেক্ষ। কেন দোষ, সুস্থ তর্ক এই জিজ্ঞাসারও সদুত্তর চায়।

বাঙালির আলাপে-আড্ডায় বৈদগ্ধ্যের চেয়ে পরচর্চার কদর বেশি। প্রযুক্তির উন্নয়নে পরচর্চার প্রসার ঘটেছে। সাহিত্যের ভুবনে বদ্ধচিন্তকদের বিচরণ সেকালের চেয়ে অবাধ হয়েছে। সহজ হয়েছে বইপ্রকাশ। অর্থের বিনিময়ে রদ্দি লেখকদের বইও বেরোচ্ছে দেদার। গুণবিচারী সাহিত্য সম্পাদক দুর্লভ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি রদ্দি লেখকদের যতটা অবাধ হওয়ার সুযোগ দিয়েছে, ততটাই উন্মুক্ত করেছে শক্তিমান লেখকদের বিচরণক্ষেত্রও। দীক্ষিত পাঠকের জন্যও প্রসারিত হয়েছে মহার্ঘকে খুঁজে নেওয়ার সুযোগ। উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্বচ্ছ করা যাক— প্রযুক্তিসঞ্জাত সামাজিক মাধ্যমের লেখালিখি থেকে এখন লেখকের গুণগত উচ্চতা বোঝা যায়, আগে যেটা সম্ভব হতো না। যিনি প্রকৃতই লেখক, তিনি লেখালেখির কোনও মাধ্যমেই হালকা বলাবলি করবেন না। অর্থাৎ সামাজিক মাধ্যমের বলাবলি থেকেও রদ্দি কবি-লেখককে চেনা যায়। ফলত ভুলক্রমেও তাদের বই কিনে ঠকার ঝুঁকি থাকে না।

একসময় পাখির পালকে কিংবা খাগের কলম লেখালিখি করেছে মানুষ। তাতে গতি এনেছে ঝরনাকলম। টাইপ রাইটার এসে নতুন দ্রততা সংযোজন করেছে লেখালিখিতে। তারপর কম্পিউটার। এখন টাচফোনে আঙুলের স্পর্শেই মনের ভাবনাকে লিপির অবয়ব দেওয়া যায়। প্রযুক্তির বহুরৈখিক উদ্ভাবনে লেখালেখির ক্ষেত্রে কৌশলগত অনেক সুযোগ যুক্ত হয়েছে। যারা ল্যাপটপে লিখে ওয়েবপত্রিকায় প্রকাশ করেন, তাদের কাগজও লাগে না। সরাসরি ই-বুকে চলে যাওয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা। অর্থাৎ উপকরণের মতো প্রকরণেও স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে।লেখালিখির প্রয়োজনে তথ্যসংগ্রহ এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ। নির্দিষ্ট কোনও লেখার টেবিল না হলেও চলে। যত্রযত্র বসে লেখার কাজ করা যায়। এতসব সুবিধার কারণে এক ভাষায় না হলেও অন্য ভাষায় নিশ্চয়ই ভালো কিছু হচ্ছে। আমরা কতটা এগোচ্ছি, দেখার বিষয় এখন সেটাই। শুধু একটা কথা মনে রাখতে হবে, উপকরণের গতি কিংবা প্রকরণের স্বাচ্ছন্দ্য সাহিত্য নয়। সৃষ্টিশীল কাজের চিরকালের দাবি মৌলিকত্ব। সৃষ্টির মৌলিকত্বই স্রষ্টাকে নিজস্বতা দেয়। যিনি লেখালিখি করছেন; তার কাছ থেকে পাঠক আরও একটি ' রাশিয়ার চিঠি' চায় না, যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখে ফেলেছেন। আরও একটি 'কবি'ও প্রত্যাশা করে না, যা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় চিরকালের পাঠকের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন। শুধু তাই নয়, লেখকের পরের বইটি আগের বইয়ের মতো হলেও পাঠক বর্জন করে।

গতি যেমন পতন ত্বরান্বিত করে, উত্থান ও উড়ালের কাজেও লাগে। যে যেভাবে ব্যবহার করে, ফলাফলও তেমন আসে। বিবিধ অরাজকতায় বাংলা সাহিত্যে নবীন সাধকের আগমন কি বন্ধ হয়ে গেছে? আশাবাদী আমি তা মনে করি না। কবি দ্রষ্টা হলে এবং লেখালিখিতে সত্য ও সুন্দরের প্রতিফলন থাকলে কোনও অরাজকতাই তাকে স্পর্শ করতে পারে না। কেমন? কবিতায় বলি—
'কোন অজ্ঞ কী অপবাদ দিল, তাতে বিভ্রান্ত হয়ে কে নির্বোধ কী বলল, রুচিহীনদের মিথ্যা বলাবলিতে কোন মূঢ় কী মনে করল— এসব ভাবলে তুমি কোনও দিনও সেইসব সত্য উচ্চারণ করতে পারবে না, যা শোনার জন্য পৃথিবী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে।

যদি শুদ্ধ হও, অযোগ্যর আস্ফালন ও মিথ্যাচার তোমাকে ঘিরে থাকলেও স্পর্শমাত্র করবে না। তুমি শুনবে পাখির কোরাস, নদীর জলকণ্ঠ ও পাতার সিম্ফনি। আর, তখনই আড়াল মুছে দেখা দেবে দিগন্তবিস্তারী সেই পথ, যা তোমাকে নিয়ে যাবে এক আশ্চর্য ভ্রমণে, যার আরেক নাম সুন্দর।'
(সুন্দর সমীপে/বিমূর্ত প্রণয়কলা)

না, নতুন কারও আসা বন্ধ হবে না। এমনও তো হতে পারে— যেহেতু 'সব কিছু নষ্টদের অধিকারে গেছে, 'নষ্টচোখে পাখিকেও আকাশের ময়লা' মনে হচ্ছে এবং সে-কারণেই দৃশ্যমান হচ্ছে না সুন্দর। নতুনের আগমন বন্ধ হয়নি বলেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর জীবনানন্দ দাশ এসেছেন। রবীন্দ্রনাথের পর যেমন জীবনানন্দ, জীবনানন্দের পর তেমন শামসুর রাহমান, শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়। তারপরও এসেছেন। ভবিষ্যতেও আসবেন। সত্য ও সুন্দরের উত্থান অনিবার্য। '' [ সুন্দর সমীপে, লেখালিখির খেলাঘরে-১১, আবু হাসান শাহরিয়ার, ৩ জুন, ২০১৯]।

জন্মবৃত্তান্ত ও আমলনামা : চেনা বামুনের পৈতা লাগে না! হুম কথা সত্য; আবু হাসান শাহরিয়ারের সাহিত্যকর্মের আমলনামা দেখার দরকার পড়ে না; বিদগ্ধ পাঠকমাত্রই জানেন তার সাহিত্যকীর্তি। তবুও নবীনদের কাছে তাকে জানার ও পড়ার আগ্রহ তৈরির মানসে কিছুটা আলোকপাতের চেষ্টা। ১৯৫৯ সালের ২৫ জুন রাজশাহীতে জন্ম। পৈতৃক নিবাস সিরাজগঞ্জের কড্ডাকৃষ্ণপুর। । তার বাবা শিক্ষাবিদ মুহাম্মদ সিরাজউদ্দীন ছিলেন একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও সরকারী কলেজের অধ্যাপক। মা লেখিকা রাবেয়া সিরাজ। এ দম্পতির একমাত্র সন্তান তিনি। কথাসাহিত্যিক মনিরা কায়েস তার জীবনী সঙ্গিনী। কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ অন্তহীন মায়াবী ভ্রমণ (১৯৮৬)। সর্বশেষ ১৫তম কাব্যগ্রন্থ ‘নোনা ব্যঞ্জনার শিলালিপি’ (১২ জুন, ২০১৯, ভাষাচিত্র)। সামাজিক গণম্যাধ্যমে প্রকাশক খন্দকার সোহেলের জানান দেয়া থেকেই নোনা ব্যঞ্জনার শিলালিপি সম্পর্কে জানা। এখনো পড়া হয়নি। কবির কাব্যগ্রন্থ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আগ্রহীরা তত্ত্বতালাশ করে নেবেন। আমরা বরং আবু হাসান শাহরিয়ারের অন্যান্য গ্রন্থ সম্পর্কে যৎসামান্য আলোকপাত করতে পারি। তার অন্যতম গ্রন্থ প্রামাণ্য শামসুর রাহমান। বাংলাদেশের অন্যতম আধুনিক কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে ত্রিশ বছরের ঘনিষ্ঠতার সুবাদে আবু হাসান শাহরিয়ার লেখেন ‌'আমরা একসাথে হেঁটেছিলাম'। এ বইয়ে।রয়েছে দুই প্রজন্মের দুই কবির মধ্যে চিন্তা-ভাবনা বিনিময়মূলক সংলাপ। এ ছাড়াও ৮টি প্রবন্ধের বই লেখেছেন, যেগুলোর অধিকাংশই কবিতা বিষয়ক, আবার দু'একটি সাংবাদিকতাকে ছুঁয়ে লেখা। আছে তিনটি কিশোর কবিতার বই, একটিমাত্র ছোটগল্পগ্রন্থ 'আসমানী সাবান'। সম্পাদনাগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- প্রামাণ্য শামসুর রাহমান (১৯৮৪); জীবনানন্দ দাশের গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত কবিতাসমগ্র (২০০৩); জীবনানন্দ দাশ : মূল্যায়ন ও পাঠোদ্ধার (২০০৩); রূপসী বাংলা (২০০৩); বনলতা সেন (২০০৪); জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০০৬); জীবনানন্দ দাশের গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত প্রেমের কবিতা (২০০৬)। আবু হাসান শাহরিয়ার ২০১৬ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

নোনা ব্যঞ্জনার শিলালিপি : সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থটি প্রসঙ্গে বলার কিংবা লেখার সময় এখনো আসেনি। সাংবাদিকতার সূত্রে আবু হাসান শাহরিয়ারের সহকর্মী যারা হয়েছেন- সে সুবাদে পাওয়া তথ্য হচ্ছে- ব্যক্তিজীবনে স্পষ্টবাদী, দৃঢ়চেতা ও আপসহীন তিনি। তবে তার কবিতায় রোম্যান্টিকতার ব্যাপ্তি ভুবনবিস্তারি। মানবমনের দ্বন্দ্ব-প্রেম-রোমান্স-রহস্য গীতল ও ছন্দোময় করে তোলেন শব্দে শব্দে। এ শব্দ কারিগরের হাতে কোনো শব্দই ফেলনা নয়! নোনা ব্যঞ্জনার শিলালিপি পড়ার আগে বরং আমরা এ বইটির ফ্ল্যাপ একপলকে দেখে নিতে পারি...
বাংলা কবিতায় এক সার্বভৌম অধ্যায়ের নাম আবু হাসান শাহরিয়ার (১৯৫৯- )। কবিতাকে তিনি ‘একার সন্ন্যাস’ বলেন। বিশ শতকের সাতের দশকে আবির্ভাব। তবে, দশকচর্চার ঘোর বিরোধী; বলেন, ‘দশক গৌণ কবিদের আশ্রয়’। নিরন্তর সাধনায় তিনি বার বার নিজেকে ভেঙেছেন এবং নতুন অনুষঙ্গে বিনির্মাণ করেছেন। নিজস্ব স্বরভঙ্গি, বাঙ্গময় চিত্রকল্প, পরাবাস্তব ঘোর ও প্রকাশপ্রকরণের নতুনত্বে রচনা করেছেন বাংলা কবিতার নতুন বাঁক। ব্রাত্যজীবন ও লোকনিজস্বতার বিপুল ভাঁড়ার তাঁর কবিতা। পুরাণের চরিত্ররা সেখানে জলের ভুবনে মাছের মতো সাবলীল আসা-যাওয়া করে। দীক্ষিত পাঠকের মুখে মুখে ফেরে তাঁর প্রবাদপ্রতিম অসংখ্য পঙক্তি।

কাব্যগ্রন্থ ‘বালিকা আশ্রম’কে হিসাবের বাইরে রাখলে ‘নোনা ব্যঞ্জনার শিলালিপি’ আবু হাসান শাহরিয়ারের ষোড়শ একক কবিতার বই। এ বইয়ের কবিতাগুলোয় কবি তাঁর স্বদেশ, সমকাল ও পৃথিবীকালকে এক উচ্চমার্গীয় বোধে দেখেছেন। শেষের কয়েকটি কবিতায় এসেছে চিরকালের মৃত্যুবোধও। বরাবরের মতো কবি ঝুঁকে থেকেছেন ব্রাত্যজীবন ও সর্বপ্রাণময়তায়। বোধের ধারাবাহিকতায় ‘নোনা ব্যঞ্জনার শিলালিপি’ শাহরিয়ারের কবিতার নতুন এক বাঁক, যে-বাঁক এই কবি আগেও একাধিকবার নিয়েছেন। কবির ৬০ বছর পূর্তিতে বইটি আগাম প্রকাশ করতে পেরে ভাষাচিত্র আনন্দিত।

তথ্যঋণ : আবু হাসান শাহরিয়ার, খন্দকার সোহেল, মুয়িন পারভেজ, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ভাষাচিত্র ও ইন্টারনেট।

* লেখাটি হোসেন শহীদ মজনুর ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া