01:17 AM, 25 May 2019
লেখক পুরস্কার পেলে একজন প্রকাশকও পুরস্কারের দাবিদার

খন্দকার সোহেল

প্রকাশক হয়েছিলাম স্বপ্ন থেকে। বাংলাদেশে প্রকাশনা নিয়ে ভিন্ন কিছু করার স্বপ্ন থেকে। আর প্রকাশক নেতা হয়েছি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে প্রকাশকদের মর্যাদার প্রশ্নটি মাথায় রেখে।

প্রায় এক যুগ অতিক্রান্ত হতে চলল, কিন্তু এই দুটি প্রশ্ন সেই যুগপূর্ব অবস্থানেই ঘুরপাক খাচ্ছে।  কোনো উত্তর পাইনি। মূল প্রসঙ্গে আসি।
প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের জন্য পাণ্ডুলিপি আহ্বান করেছে।  অনেকেই করে আজকাল।  যারা প্রকাশনা নিয়ে, বই নিয়ে কাজ করে তারাও করে।  যাদের সঙ্গে প্রকাশনার কোনো সম্পর্ক নেই তারাও করে। বাংলাদেশের প্রকাশনায় কিংবা বলতে গেলে বইয়ের পুরস্কার কিংবা আরও স্পেসিফিক করে বলতে গেলে লেখকদের পুরস্কার দেয়ার লিস্টটা ইদানিং বেশ বড়োসড়ো। 
কিন্তু কেন এত এত পুরস্কার? 
আদৌ উদ্দেশ্যটা কী?
প্রশ্নের উত্তর হাতড়ে বেড়ানোর চেষ্টা করেছি অনেক। অনেকের সঙ্গে আলোচনা-পর্যালোচনা করেছি। কেউ সদুত্তর দিতে পারেনি। উত্তর যা পেয়েছি তা হলো-
- পুরস্কার দেয়া হয় গোষ্ঠিবাদিতা বা সিন্ডিকেট তৈরি করার জন্য।
- কেউ কেউ এটা নিয়ে ব্যবসা করে।
- কেউ কেউ সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য পুরস্কার চালু করেছে।
পজেটিভ মন্তব্যের মধ্যে একটাই কয়েকজনের কাছে শুনেছি। সেটা হলো, পুরস্কারের বিনিময়ে বিভিন্ন লেখক অন্তত কিছু অর্থ পাচ্ছেন। 
লেখকের জন্য এই অর্থমূল্যটা গুরুত্বপূর্ণ অবশ্যই।


বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রকাশনার উন্নয়ন এবং এইসব তথাকথিত পুরস্কার নিয়ে জানতে চাইলে কেউ কেউ তুলনা করেছেন চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে। চলচ্চিত্রে পুরস্কার প্রদান করা হয়। সরকারি পর্যায় কিংবা বেসরকারি পর্যায়, পুরস্কার প্রদান করা হয় পুরো শিল্পকে প্রনোদনা দেয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে। একজন লেখক বা চিত্রনাট্যনার যেমন সেখানে পুরস্কার পান, একইসঙ্গে পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হন প্রডিওসার, অর্থাৎ যিনি অর্থলগ্নি করেন। একইসঙ্গে পুরস্কার পান পরিচালক, গায়ক, নায়ক বা নায়িকা, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, নৃত্য পরিচালক, কোরিওগ্রাফার, সম্পাদক, রূপসজ্জাকর এবং পোশাক-পরিচ্ছদ ডিজাইনারও। বিভিন্ন দিক নিয়ে যারা কাজ করেন সকলেই এই পুরস্কারপ্রাপ্তির ফলে সম্মানিত বোধ করেন এবং অবশ্যই তাদের কাজে আরও মনোনিবেশ করেন।


কিন্তু বাংলাদেশের প্রকাশনাসংশ্লিষ্ট পুরস্কার মানেই হলো লেখক। লেখক ছাড়া এই অঙ্গনে কোনো সম্মান বা সম্মাননা নেই বললেই চলে। বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলা চলাকালীন দুয়েকটা পুরস্কার দেয়া হয় প্রকাশককে। কিন্তু এটা তেমন একটা গুরুত্ব বহন করে না। 


পুরস্কার দেনেওয়ালা একটি পত্রিকার আয়োজকদের একজনকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, আচ্ছা আপনারা যে বইটি পুরস্কার দেন, তার প্রকাশককে কি পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে দাওয়াত কার্ড পাঠান।  বা তিনি কি জানতে পারেন তার প্রকাশিত বইটি বা বইটির লেখক পুরস্কৃত হলো।  তিনি আমতা আমতা করেছেন।  জবাবটি দিতে পারেননি।  পরে তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, আপনারা যখন পুরস্কারের জন্য বই আহ্বান করেন তখন প্রকাশকদের কাছে বই আহ্বান করেন কেন? আপনাদের কি একটু লজ্জাবোধ হওয়ার কথা নয়, যেই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে পুরস্কার পাওয়া বইয়ের প্রকাশক ব্রাত্য হয়ে যান, সেই পুরস্কারের জন্য আপনারা প্রকাশকের কাছেই বই চান কোন মুখ নিয়ে?
নাহ্। সদুত্তর পাইনি। অবস্থা এমন হয়ে গেছে এই দেশে, কোনো প্রকাশনীর বই পুরস্কৃত হলেই ধরে নেয়া হয় প্রকাশক ধন্য হয়ে গেল। তাই তাদের কোনো সম্মানের ধার ধারেন না পুরস্কারবাজরা।


আমার প্রকাশনীর দুটি বইয়ে এমন পুরস্কারের তকমা আছে। দ্বিতীয়টির লেখক খুব কাছের হওয়ায়, এবং পুরস্কার নিয়ে আমার ধ্যান-ধারণা জানতে পারায় আয়োজকদের বলে প্রকাশকের জন্য আমন্ত্রণপত্র ইস‌্যু করিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথমজন কোনো কিছুর ধার ধারেননি। প্রথমজন ভেবেই নিয়েছেন তিনি পুরস্কার পেলেন মানেই প্রকাশক ধন্য হয়ে গেল। পুরস্কার পাবার খবরটিও তিনি প্রকাশককের জানানোর প্রয়োজন বোধ করেননি। উল্টো খুব মন খারাপ করেছেন কিছুদিন বাদে। পুরস্কার পাবার পরেও কেন বইটিতে লাল রঙের একটি ব্যান্ডে "পুরস্কারপ্রাপ্ত বই" লিখে বইয়ের কাভারে জুড়ে দেয়া হলো না!

এই লেখার মূল উদ্দেশ্য দুইটি। 
এক, লেখক ছাড়া যেহেতু পুরস্কারওয়ালারা প্রকাশক বা প্রকাশনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্য কাউকে পুরস্কার দিতে পারেন না, কিংবা দিতে ইচ্ছুক নন। তাই এ ধরনের পুরস্কারে আপনারা বই চাইবেন কেবলই লেখকের কাছে।  আর যদি প্রকাশকের কাছেও বই চান, তাহলে পুরস্কারপ্রাপ্ত বইয়ের প্রকাশককে অনুষ্ঠানের দিন অন্তত আমন্ত্রণ করার ভদ্রতাটুকু আপনারা আয়ত্ত্ব করুন।  প্রকাশকের সম্মানটুকু দিন।  যেহেতু নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে প্রকাশক আপনাদের বই পাঠান তাই এই সম্মানটুকু তার প্রাপ্য।
দুই, বাংলাদেশের প্রকাশনাশিল্পের উন্নয়নে পুরস্কারপ্রথা চালু হওয়া উচিত।  সরকারি বা বেসরকারিভাবে।  লেখক পুরস্কার পেলে একজন প্রকাশকও পুরস্কারের দাবিদার হতেই পারেন।  একইসঙ্গে বইয়ের প্রচ্ছদশিল্পীও পুরস্কার পাওয়ার দাবিদার। ভালো সম্পাদক নেই বলে বলে সারাবছর আমরা যারা গলাবাজি করি, তাদের অন্তত ভালো সম্পাদনার জন্য সম্পাদককেও পুরস্কার দেয়ার রেওয়াজ চালু করার কথাটা বলা উচিত।  একইসঙ্গে বুক ডিজাইন কিংবা মুদ্রণ ও প্রোডাকশনে পুরস্কার প্রথার প্রবর্তন হওয়া উচিত।


শুধু লেখককে পুরস্কারের আওতায় এনে একটি ইন্ডাস্ট্রির সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর যদি আপনারা লেখককেই একমাত্র এবং অনন্য বলে মনে করেন তাহলে পাণ্ডুলিপি পুরস্কার প্রবর্তন করুন। একটি বইয়ের কৃতিত্ব মানেই শুধু একজন লেখক নয়, পাণ্ডুলিপি লেখকের। পুরো বই মানেই হলো আরও আরও কিছু মানুষের মেধা, শ্রম, সৃজনশীলতার সমন্বয়।

লেখক :  Editor & Publisher at ভাষাচিত্র (BHASHACHITRA)

 *লেখকের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে অনুমতি  সাপেক্ষে প্রকাশিত।