09:29 PM, 10 Mar 2018
 সরাসরি যা বলতে পারি না তা কৌশলে বলি

মাহবুবা হোসেইন। ১৯৬৪ সালের ১২ জানুয়ারি জন্ম হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে। গ্রাম বানকুট, উপজেলা দেবীদ্বার, জেলা কুমিল্লা। বাবা মঈনুল হোসেইন।

মা মাজেদা খাতুন। বাবা ছিলেন সার্কেল অফিসার ডেভেলপমেন্ট। বাবার চাকরি সূত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ভ্রমণ ও অবস্থান। কৈশোর কেটেছে ময়মনসিংহে। তিন ভাই সাতবোনের মধ্যে অষ্টম। ঢাকার মুসলিম মডার্ন একাডেমি থেকে ১৯৮০ সালে এসএসসি। ১৯৮২ সালে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি। ঢাকা ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স। ১৯৯১ সালে নবম বিসিএসএ সহকারী কর কমিশনার (ট্যাক্সেস) হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত। বর্তমানে কর কমিশনার, কর অঞ্চল ঢাকায় কর্মরত। বইপড়া, গান শোনা, কবিতা লেখা শখ। সহজ জীবনযাপন তার আদর্শ। স্বামী খুরশিদ আলম পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব এবং দুই ছেলে রাসিমুল আলম ও ইবতিদুল আলমকে নিয়ে বসবাস। ২০১৬ সালের বইমেলায় বের হয় কবিতার বই ‘অর্ধনারী’ ও ‘হঠাৎ নির্ঝর।’ সাহিত্যজীবন-লেখালেখি বিষয়ে মাহবুবা হোসেইন কথা বলেন বাংলানামার সঙ্গে।
আপনার শৈশব কেটেছে কোথায়?
বাবার চাকরিসূত্রে বাংলাদেশে বিভিন্ন জেলায় আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে। ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, কটিয়াদীতে। বাবা ছিলেন সার্কেল অফিসার। এরপর কেটেছে ফরিদপুরের ভাঙ্গায়। বাবা মুন্সীগঞ্জে ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে অবসরে যান।
আপনি ভিন্ন একটি সেক্টরে কাজ করেন, লেখালেখিতে তা প্রতিবন্ধক কি না?
না। লেখালেখি তার নিজস্ব গতিতেই চলছে। কখনো আমার পেশাগত জীবন লেখালেখির জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। খুব ছোটবেলা থেকেই লিডিং বা ক্ল্যাসিক উপন্যাস পড়ার অভ্যাস ছিল। শরৎচন্দ্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বনফুল, তারাশঙ্কর, রবীন্দ্রনাথ পড়া হয়েছে। এ কালে যারা লেখেন সেলিনা হোসেনসহ অধিকাংশ লেখকদের লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। ছোটবেলা থেকে ডায়েরি লিখতাম। যেটা আমার অনুভূতিতে নাড়া দিতো সেগুলোতে কাল্পনিক চরিত্র দিয়ে গল্পের মতো ফুটিয়ে তুলতাম। গল্পটি আমার কিংবা আমার অনুভূতির কিন্তু তাতে অন্য একটি চরিত্র স্থাপন করায় সেই গল্পটি চরিত্রের গল্প হয়ে যায়। এভাবে নিজের অনুভূতিগুলো মোবাইল, নোটপ্যাড কিংবা মেইলে টুকে রাখতাম। একদিন আমাদের পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে আমার লেখা এরকম ছোট একটি গল্প শোনালাম। সেখানেও প্রশংসা পেলাম। একবার নাজমা পারভীনের দুরবাসিনী বইটি পড়েছিলাম। বইটি পড়ার পর আমার মনে হলো এরকম তো আমিও লিখতে পারব। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লেখা দিলাম। সেখানে লাইক-কমেন্ট আসতে লাগল।
মুদ্রিত লেখক হিসেবে যাত্রা শুরু কবে?
মুক্তভাসের প্রকাশক জাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো। তিনি আমার লেখাগুলো দেখে প্রশংসা করলেন। এরপর কবিতাগুলো বাছাই করে তিনি বই বের করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ২০১৬ সালের অক্টোবরে বের হলো ‘অর্ধনারী’ গ্রন্থ। ওই বছরের বইমেলায় বের হলো কাব্যগ্রন্থ ‘হঠাৎ নির্ঝর’।
বই বের হওয়ার পর পাঠকমহল থেকে কেমন সাড়া পেলেন?
আশেপাশে লেখকের তো কোনো অভাব নেই। পাঠকদের কাছ থেকে সাড়া পাওয়ার জন্য তো সময় লাগে। তাছাড়া আমি তো একদমই নতুন, লেখক মহলে অতটা পরিচিতও নই। তবে দুটো বই প্রকাশের পর যে সাড়া পেয়েছি তাতে আমার স্পৃহা আরো বেড়েছে। মাগুরার এক পাঠক ফোন করে জানালেন, ‘আপনার কবিতা সুন্দর হয়েছে। লেখালেখি থামিয়েন না।’ ফেসবুকে অনেকেই আমার লেখার প্রশংসা করছেন। এছাড়া এখন তো বই কেনার প্রবণতা একদম নেই বললেই চলে। পাঠক যত বেশি বই পড়বে, তত বেশি রেসপন্স তাদের কাছ থেকে আসবে।
লেখালেখি নিয়ে আগামী দিনের পরিকল্পনা কী?
আমার কিছু গল্প আছে। গল্পটা নিয়ে কাজ করতে চাই। আমি মনে করি গল্পের বিষয়টি আমার নিয়ন্ত্রণে আছে। আমার আত্মবিশ্বাস আছে গল্পটা চাইলেই আমি লিখতে পারি। আর কবিতার বিষয়টি সেটা তো ঐশ্বরিক। চাইলেই এই মুহূর্তে কবিতা লেখা যাবে না। কবিতা সবসময় আসে না। যখন কবিতার থিম আসে তখন হুড়হুড় করে শব্দমালা বের হয়ে যায়।
কোন কোন বিষয়কে গল্পে রূপ দিতে চান?
ব্যক্তি ও সমাজের সংকট, অর্থনৈতিক সংকট, ব্যক্তির দহন প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিকে গল্পে ফুটিয়ে তুলতে চাই। তবে সব কথা সরাসরি বলা যাবে না। কারণ আমি সরকারি চাকরি করি, আমাকে গল্প বলার সময় এগুলো মাথায় রেখেই গল্প বলতে হবে। তবে আমাকে কৌশলী হতে হবে। যা সরাসরি বলতে পারব না তা কৌশলে বলতে হবে।
সমসাময়িক যারা লিখছে তাদের লেখা কি পড়ছেন?
সাহিত্য সাময়িকীগুলো তো আমি সংগ্রহে রাখি। রিপন ইমরান নামে একজন আছে। তার লেখা নীল লোহিতের মতো। যে স্পট ধরে ধরে লিখত। দেখা গেল কোনো ফেরিঘাটে গেল, ফেরিঘাট নিয়ে সে তৎক্ষণাৎ লেখা লিখে ফেলল। তার লেখা পড়লে মনে হতো চোখের সামনে তৈলচিত্রে ভেসে উঠছে যাবতীয় দৃশ্যপট। এছাড়া এখনকার মেয়েরাও তো ভালো লিখছে। সাদিয়া সুলতানা, মেরিনা ইভান, লজ্জাতুল কাউনাইম এরা লিখছে।  এদের লেখা আমার ভালো লাগে।
অর্ধনারী কবিতাটি নারী বিষয়ক কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা?
আমি ইতিবাচক চিন্তা করি। আমি বিবর্তনবাদে বিশ্বাস করি। আমাদের নারী সমাজ বিবর্তন-রূপান্তরের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার মা মাজেদা খাতুন কবিতা লিখতেন। লুকিয়ে রাখতেন। ভাবতেন কবিতা লেখা সামাজিক পাপ যেন। ভয়ে-লজ্জায় কাউকে বিষয়টি বলতেন না। এখন তো মেয়েরা এই ভয়-লজ্জা থেকে বেরিয়ে এসেছে। তারা সাহসের সঙ্গে লিখছে। আমারও নিজস্ব জীবন আছে, সবার জন্য আমার জীবন আছে। আমি ঘুরতে যাই আর পরিবারকেও সময় দিই। এখনকার নারীরা যেমন সামগ্রিক আবার ব্যক্তিক। আমার মায়ের ব্যক্তিগত জীবন ছিল না, সামগ্রিক জীবন ছিল। এখন তো সেই অবস্থা পরিবর্তন হয়েছে। এখনকার নারীরা একাধারে ব্যক্তিক ও সামগ্রিকও। নারী এখন সংসারের কোনো বিষয়ে মতামত দিতে পারে। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় স্বামী জিজ্ঞাসা করে এটা করতে চাই, ওটা করতে চাই তুমি কী বলো? আমি মনে করি সমাজ বা সংসারে নারীর যে গুরুত্ব বাড়ছে তা নারীর বিবর্তনের ফসল।
আপনাকে ধন্যবাদ
ধন্যবাদ বাংলানামাকে।